কবি শঙ্খ ঘোষ “ শূন্যের ভিতরে ঢেউ ” কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন “তার চেয়ে আর কোনও দীর্ঘতর যবনিকা নেই! / কেননা পড়ন্তু ফুল, চিতার রূপালি ছায়ই, ধাবমান শেষ ট্রাম/ সকলেই চেয়েছে আশ্রয়। ”
পদ্মাপারে শুরু হয়েছে নতুন আশ্রয় খোঁজার ঠিকানা। নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত ইউনুস এবং তাঁর উপদেষ্টারা। অবৈধ সরকারকে যে এতো তাড়াতাড়ি যেতে হবে, সেটা কল্পনা করতে পারেননি নোবেল ম্যান। তাঁর এবং তাঁর সভাসদদের মনে অদ্ভুত একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল। তাঁরা চিরকালের জন্য থেকে যাবেন। নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাবেন রাজ্যপাট। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল তার বড়ো প্রমাণ। তাদের মনে আরও একটা বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল। সেই বিশ্বাস হল জামায়াত ক্ষমতায় আসতে চলেছে। বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ঘন ঘন বৈঠক। ওয়াশিংটন পোস্টের মতো একটি দামি ও নামি কাগজে এই রাজনৈতিক দলকে নিয়ে লম্বা প্রতিবেদন- সব কিছু ভুল প্রমাণ করে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে তারেক রহমান। ফলে, ইউনূস এবং তাঁর সভাসদদের দেশে থাকা মানে বড়ো ধরনের বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়া। জানের এখনও দাম আছে। মানের দাম অনেক আগেই হারিয়েছেন ইউনূস এবং তাঁর সহযোগিরা।
বলা হচ্ছে খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। যে আশা নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, অর্থাৎ জীবনের বাকি দিন একটি স্বচ্ছন্দে কাটানো, মেজাজ থাকবে তুরীয়, ভোটের ফলাফল তাঁর সব হিসেব উল্টে দিয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল প্রকাশ্যে ক্ষমতায় না থেকে কী ভাবে অন্তরালে থেকে ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর সেই ছক অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দি চুপ্পুর ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছিল। তাকে জেনেশুনে অপমান করা হয়। যাতে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। আর সেটা হলে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়াটা খুব সহজ হয়ে যেত ইউনুসের। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। ফলে, ইউনুস উল্টে চাপে পড়ে যান।
সংস্কারের নামে ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন বিদায়ী সরকার প্রধান। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে নাম দেওয়া হয়েছে গণভোট। সংবিধান সংস্কারের নামে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস করে তা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ, সংসদ ভোটে যেই জয়ী হোক না কেন, দেশটা আসলে চালাবেন রাষ্ট্রপতি। আর সে কারণে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য নানা ফন্দিফিকির খুঁজছিলেন মুহাম্মদ ইউনুস। সংস্কারের নামে নিজের জন্য রাষ্ট্রপতির পদকে শক্তিশালী করেছেন। আগে ভারতের মতোই ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। কিন্তু সংস্কারের ষড়যন্ত্র করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্দি করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাষ্ট্রপতি নিজেই নিয়োগ দিতে পারবেন। ইউনূসের ইচ্ছা ছিল, তিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে সেই সব গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর পছন্দের লোককে নিয়োগ করা। তাহলে সরকারের ওপর তাঁর কতৃত্ব থাকবে।
সোমবার জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ তিনি দিয়েছেন, সেখানেও তিনি সংস্কার প্রসঙ্গে উত্থাপন করেন। ইউনুস বলেন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন ও সংস্কার হয়েছে ১৩০টি আইন। ৬০০টি নির্দেশ জারি করা হয়েছে, তার মধ্যে ৮৪ শতাংশের বেশি কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে ইউনূসের পরামর্শ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার উপরে জোর দেওয়া উচিত। শনিবার নিজের বক্তব্য পেশের সময়ে প্রধান উপদেষ্টা জানান, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি নিলেও, দেশের অন্য নাগরিকদের মতো তিনিও নতুন বাংলাদেশ গড়ার ‘দায়িত্ব’ পালন করবেন। কিন্তু রাজনীতি সবসময় এক সরলরেখায় চলে না। সেটা তিনি আন্দাজ করতে পারেননি। তাই, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর সামনে দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই।












Discussion about this post