বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ায় কৌশল ঠিক করতে বৈঠকে বসছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা। আজ (মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মিডিয়া সেল এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ অনুসারে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন। এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি সংবিধানে নেই। তারা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। তাই, সংসদ সচিবালয়ে প্রস্তুতি থাকার পরেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অনুষ্ঠান হয়নি। সদ্যঃসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা পর্যায়ক্রমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তাঁদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি থাকলেও সেই শপথ গ্রহণ করেননি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচিত ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কোনও সিইসি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করালেন।
এর আগে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠের জন্য স্পিকার ছিলেন না। সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী, দেশের আইনসভার সদস্যরা তাঁদের দায়িত্ব পালনের শপথ নেন আগের সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে। তবে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে নেই, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে। সে কারণে সংবিধানের বিকল্প বিধান অনুসারে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সিইসির কাছ থেকে শপথ নেন।
গতকাল পর্যায়ক্রমে বিএনপির ২০৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়জন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, খেলাফত মজলিসের একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুজন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) একজন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাতজন শপথকক্ষে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সচিব কানিজ মওলা। মঙ্গলবার দিন সকাল থেকে শপথ নিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় আসতে থাকেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তাঁরা বলেন, ‘সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব এবং সংসদ সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিব না।’ শপথগ্রহণ শেষে সবাই শপথপত্রে নিজেদের আসনের নাম লিখে সই করেন। এরপর সংসদ সচিবালয়ে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন। সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিতদের শপথ পড়ানোর পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যদের শপথও পড়ান সিইসি। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ তাদের জোটের সদস্যরা এই শপথ নিলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ও স্বতন্ত্র সদস্যরা এই শপথ নেননি।
এ বিষয়ে শপথগ্রহণের আগে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম থাকলেও আমরা (বিএনপি) কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। এ ছাড়া সংবিধানে এটা এখনো ধারণ করা হয়নি। এই শপথের বিধান সংবিধানে নেই। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি, সামনের দিনেও চলব।’
এর পরই জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথগ্রহণ কক্ষে আসতে শুরু করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের নির্বাচনে জয়ী অন্য নেতারা শপথ নেন। প্রথমে তাঁরা সংসদ সদস্য হিসেবে এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এর আগে সংসদ ভবনে এক বৈঠকে শপথগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করেন। তৃতীয় ধাপে একইভাবে শপথ গ্রহণ করেন এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এরপর গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং পরে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। তবে তাঁরাও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি।
এই অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কী হবে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।












Discussion about this post