নির্বাচন শেষ। ব্যালটবাক্স সিল হয়েছে। নির্বাচনে ফলাফলও ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন জামায়াত ইসলাম। নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের পর বাংলাদেশে চলতে শুরু করেছে গণতন্ত্রের রেলগাড়ি। প্রশ্ন ভোটেই কি একটি রাষ্ট্র চলে? না কি ভোটের বাইরে, ক্যামেরার বাইরে, মঞ্চের বাইরে আরও একটি অদৃশ্য শক্তি সুতো টানে? বাংলায় পালাবদল বেশ কয়েকটি শব্দের জন্ম দিয়েছে। তার মধ্যে বহুল চর্চিত শব্দ হল ডিপ স্টেট। এটা দেখা যায় না। অনুভব করা যায় না। অথচ এর শক্তি ভয়াবহ। হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পিছনে কাজ করেছে এই ডিপ স্টেট।
একটা সহজ প্রশ্ন? জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি সব সিদ্ধান্ত তারাই নেন? সংবিধান বলবে “হ্যাঁ”। তবে পুরোটা নয়। রাষ্ট্র মানে শুধু প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভা নয়। রাষ্ট্র মানে সামরিক বাহিনী, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কৌশলতগত দফতর, বড়ো কর্পোরেট স্বার্থ, এমনকী আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার চাপ। এই পুরো জালটাই রাষ্ট্র কাঠামো। নির্বাচন হল। সরকার বদল হল। কিন্তু রাষ্ট্র কাঠামোর আদৌ বদল হল কি? সচিবালয়েল ফাইল কি বদলে গিয়েছে? বডো় ব্যবসায়ীক চুক্তির দিক কি হঠাৎ উল্টে গেল? এখানেই আসে ডিপ স্টেট ধারণা।
এটা কোনও গোপন অফিস নয়। কোনও কালো কাচের ঘর নয়। এটা একটা নেটওয়ার্ক। একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যারা সরাসরি নির্বাচিত না হয়েও রাষ্ট্রের নীতি ও নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে। তারাই হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রক শক্তি। রাষ্ট্রের ভিতরে আরও একটি রাষ্ট্র। দৃশ্যমান সরকারের নীচে অদৃশ্য কাঠামো। ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে?
প্রথম কৌশল ধারাবাহিকতা। রাজনীতিবিদেরা পাঁচ বছর পর পর আসেন। কখনও একই সরকার বছরের পর বছ ক্ষমতায় থেকে যায়। কোনও কোনও সময় ক্ষমতায় ঘটে পালাবদল। কিন্তু পরিবর্তন হয় না আমলা মহলে। তারা থেকে যান দশকের পর দশক। একমাত্র অবসর নিলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানে অন্য এক আমলাকে নিয়োগ করা হয়। কোনও কোনও সময় একই আমলাকে দুটি দফতরের দায়িত্ব সামাল দিতে হয়। নীতির খসড়া তাদের হাতেই তৈরি হয়। নতুন মন্ত্রী অনেক সময় সেই ফাইলে সই করেন, যেটা তিনি নিজে লেখেননি।
দ্বিতীয় কৌশল তথ্যের নিয়ন্ত্রণ। গোয়েন্দা সংস্থা বা নিরাপত্তা সংস্থা যদি নির্বাচিত সরকারকে নির্দিষ্টভাবে সাজানো তথ্য দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত সেই তথ্যের ওপর দাঁড়ায়। তথ্য মানে ক্ষমতা, তথ্য মানে দিক নির্দেশ। তৃতীয় কৌশল হল অর্থনৈতিক প্রভাব। বড়ো কর্পোরেট গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা, ঋণদাতা, অস্ত্র ব্যবসা, জ্বালানি চুক্তি- এইগুলি কেবল অর্থনীতি নয়। এগুলি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র কোনও বড়ো ঋণের ওপরে নির্ভরশীল হলে, তা হলে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়। আর সেই সীমাবদ্ধতার ভিতরে ডিপ স্টেটের মতো কাঠামো কাজ করার সুযোগ পায়।
চতুর্থ কৌশল সংকটের সদ্ব্যবহার। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক ধাক্কা – স্থিতিশীলতার কথা বলে সামনে আসে ডিপ স্টেট। কখনও দেখা যায় সংকট এমনভাবে বাড়ে যাতে নির্দিষ্ট একটি শক্তি বাড়তি নিয়ন্ত্রণ পায়। তুরস্কে ডেরিন ডেভলেট শব্দটি আলোচনায় আসে। অভিযোগ ছিল, সামরিক এবং বেসমারিক অভিজাতদের একটি নেটওয়ার্ক নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করত। মিশরেও একই অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের মুখে শোনা গিয়েছে ডিপ স্টেট শব্দটি।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ডিপ স্টেট মানেই সব কিছু ষড়যন্ত্র না। সব অদৃশ্য প্রভাব দুষ্টচক্র নয়। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা দরকার। পেশাদার আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা কাঠামো দরকার। কিন্তু যখন সেই কাঠামো নির্বাচিত নেতৃত্বের বাইরে নিজস্ব অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করে, তখন সেটা সমস্যা হয়ে ওঠে।












Discussion about this post