একটি চিঠি। চিঠিটি এসেছে আমেরিকা থেকে। লিখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিঠির প্রাপক বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পদ্মাপারের রাজনীতিতে এখন এই চিঠি নিয়ে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষেকরা তাদের মতো করে এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। তবে সব বিশ্লেষণের মূল সুর একটাই – এই চিঠি আসলে অভিনন্দন বার্তা নয়, এটা আসলে অভিনন্দন বার্তার মোড়কে প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি। এই চিঠির মধ্যে দিয়ে আর একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেটি হল খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্তি। খলিলুরকে কেন পররাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা এই চিঠি থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগে ইউনূস আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি করেছিলেন। এই চুক্তি নিয়ে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভোটের আগে কী এমন প্রয়োজন হল যে আমেরিকার সঙ্গে তদারকি সরকারকে চুক্তি করতে হল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিএনপি যে ক্ষমতায় আসতে চলেছে আর তারেক রহমান যে প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন, সে ব্যাপার রাজনৈতিকমহল যেমন নিশ্চিত ছিল, নিশ্চিত ছিলেন ইউনূস। তাই, প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাতে তিনি সর্বেসর্বা না হতে পারেন, ক্ষমতাশালী হতে না পারেন, তার জন্য ক্ষমতার প্রধান মূল কেটে দিলেন ইউনূস। বলা হচ্ছে, সেই চুক্তির ফলশ্রুতিতেই ট্রাম্পের এই অভিনন্দনবার্তা।
আগে দেখা যাক তারেককে লেখা চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি জানিয়েছেন?
তারেককে পাঠানো চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, “ আশা করি, পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন করে আপনি আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অসাধারণ গতি বজায় রাখতে সাহায্য আমাকে করবেন। এর ফলে দুই দেশের কৃষক এবং শ্রমিকদের উপকার হবে। আমি আশা করি রুটিন প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলি সম্পন্ন করতে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন এবং পদক্ষেপ করবেন। এর ফলে আপনার সেনাবাহিনী আমেরিকার তৈরি বিশ্বসেরা এবং উন্নত মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবে। ” চিঠির একেবারে শেষে যুক্তরাষ্ট্র এবং আমেরিকার সম্পর্ককে আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এসময় বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে বলেও জানানো হয়।
চিঠির বয়ান বলে দিচ্ছে, এটা মোটেই অভিনন্দন বার্তা নয়। কারণ, চিঠিতে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তি হয়েছিল ইউনূসের আমলে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিগুলি সম্পন্ন করার। সেই চুক্তি হলে আমেরিকা সামরিকখাতে যে সব সরঞ্জাম তৈরি করে, বাংলাদেশ সেই সব সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবে। এই চিঠিকে কোনওভাবেই অভিনন্দন বার্তা নয়। শুরুতে তারেককে সৌজন্যের খাতিরে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মূল উদ্দেশ্য যে ডলার রোজগার করার, সেটা চিঠির বয়ান বলে দিচ্ছে। এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকেও বেঁধে ফেলা হয়েছে। যেটা আরও আপত্তিজনক তিনি বাংলাদেশে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূতের ওপর আস্থা রেখেছেন। অর্থাৎ ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বিশেষ একটি অ্যাজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।
২০১৮ সালে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি দুই দেশের মায়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও বাডা়তে প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবেন। একই সঙ্গে তিনি সুষ্ঠু ও পারস্পরিক বাণিজ্য বিনিয়োগ, মানবাধিকার রক্ষায় অঙ্গীকার, ব্যক্তির মতপ্রকাশ গণতান্ত্রিকায়নে সরকারে মনোযোগ থাকার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন। চিঠিতে ট্রাম্প উভয় দেশের উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
হাসিনাকে পাঠানো অভিনন্দন চিঠি আর তারেককে পাঠানো অভিনন্দন চিঠির বয়ানের মধ্যে যে বিরাট তফাৎ রয়েছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তারেককে পাঠানো অভিনন্দন বার্তার উদ্দেশ্য কি সেটা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।












Discussion about this post