টানা ১৮ মাসের টালমাটাল সময় কাটিয়ে শেষপর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ত্যাগ করলেন মহম্মদ ইউনূস। তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেছেন। ফলে তাঁর প্রয়োজন ফুরিয়েছে সংবিধান অনুযায়ী। কিন্তু তাও যেন ইউনূস প্রসঙ্গ বাংলাদেশ থেকে মুচ্ছে না।তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হবে কিনা তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে রবিবার টানা ১৮ মাস পরে নিজের এনজিওতে ফিরলেন ইউনূস।রবিবার ঢাকার মীরপুরে নীচের কার্যালয়ে ফেরেন ইউনূস। তাঁকে দেখে দুপাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান তাঁর অফিসের কর্মীরা। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করেছেন ইউনূস নিজেই।১৮ মাস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পর গত রবিবার অধ্যাপক মহম্মদ ইউনূস তাঁর আগের কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। সেখানে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।দেশের প্রধান উপদেষ্টা পদ ছাড়ার পর তাঁর বিদায়ী ভাষণে মহম্মদ ইউনূস বলেন, আজ থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব থেকে সরে আসছে। এখন থেকে গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও মানুষের মৌলিক অধিকারের লালন ফিরে আসুক বাংলাদেশে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ইউনূস নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন। যুবসমাজকে অনেক স্বপ্ন দেখানো শুরু করেন স্বপ্নের কান্ডারী ইউনূস।৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাল ধরার পর, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অর্থাৎ বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলে তিনি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর মাধ্যমে গত ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
ঠিক এরই মধ্যে আবারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ইউনূস অধ্যায়। তবে কি বাংলাদেশে ফের ইউনূস ঝড় আসন্ন। তবে এই ঝড়ে নিজের পায়ের মাটি যে সরতে চলেছে তা মনে হয় টের পাচ্ছেন স্বয়ং ইউনূস সাহেব নিজেই। একদিকে যখন ইউনূস রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ঠিক সেই সময়ই বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইউনূসের রাজত্বের সময়কালীন প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূসের একের পর এক কুকীর্তি ফাঁস করছেন জনসমক্ষে।এ বার ইউনূস প্রসঙ্গ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললেন সে দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল নিয়ে এ বার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন সে দেশের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দাবি, তাঁকে একপ্রকার অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে ফেলারও চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
ইউনূসের কার্যপদ্ধতি নিয়ে যে তাঁর অসন্তোষ রয়েছে, তা নিয়ে কোনও রাখঢাক করেননি সাহাবুদ্দিন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনও বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন। কী আলোচনা হল, কী হল, কোনও চুক্তি হল কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হল— এটা আমাকে লিখিত ভাবে অবহিত করার কথা। উনি তো বোধহয় ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরে গিয়েছেন। একবারও আমাকে জানাননি। একবারও আমার কাছে আসেননি।’একপ্রকার রাষ্ট্রপতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আসনে বসা ইউনূস।
এমনকি আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও ইউনূসের তৎকালীন প্রশাসন তাঁকে কিছুই জানায়নি বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কোনও কিছুই আমি জানি না। এই রকম একটা চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। এটা ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই আগের সরকার প্রধানেরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আর এটি হল সাংবিধানিক একটা বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি তো তা করেননি।’ লিখিত বা মৌখিক— কোনও ভাবেই ইউনূস তাঁকে জানাননি বলে দাবি সে দেশের রাষ্ট্রপতির।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পরে ইউনূস তাঁর সঙ্গে আর সে ভাবে যোগাযোগ রাখেননি বলেও সাক্ষাৎকারে জানান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ইউনূস একটি বারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন।’রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কথায়, ওই দেড় বছর তিনি কোনও আলোচনায় ছিলেন না। অথচ তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন চক্রান্ত চলেছে। তিনি বলেন, ‘দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।’ কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনও ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি বলে জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, ‘অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভাল, তা বলা যাবে না।’বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দাবি, প্রাথমিক ভাবে গণঅভ্যুত্থানের কয়েক জন নেতার চাপে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। ওই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলি চাইলে তবেই তাঁকে অপসারণ করা যাবে। তবে বিএনপি-র এক শীর্ষনেতা ওই সময়ে তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। যদিও কোনও নেতার নাম ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেননি রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, ওই বিএনপি নেতা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কোনও অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।’সাহাবুদ্দিন আরও জানান, রাজনৈতিক স্তরে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পরে অন্তর্বর্তী সরকারই এ বিষয়ে পদক্ষেপ করে। এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিক উপায়ে তাঁর জায়গায় বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমন ‘অসাংবিধানিক কাজে’ রাজি হননি। ফলে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয় বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির।
অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি ইউনূসের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।সাক্ষাৎকারে তাঁর দাবি, ওই পরিস্থিতিতে ইউনূসের কাছ থেকে কোনও ফোন পাননি তিনি। ইউনূস তাঁর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও অবস্থানেই ছিলেন না ওই সময়ে।এই অভিযোগগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন বলেছেন, “সংবিধান অনুযায়ী, চিফ অ্যাডভাইজার বিদেশ সফরে গেলে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে আলোচনা, চুক্তি এবং ফলাফলের বিস্তারিত লিখিত রিপোর্ট দিতে বাধ্য। কিন্তু ইউনুস সাহেব ১৪-১৫ বার বিদেশ গিয়েছেন, একবারও আমাকে জানাননি। আমার সঙ্গে দেখা করেননি, কোনও লিখিত তথ্যও দেননি। আমাকে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।”বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, এটা ইউনূসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পুরনো শক্তির প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা। তো আবার কেউ বলছেন শেখ হাসিনার করে যাওয়া রাষ্ট্রপতি, এখন আওয়ামী লীগকে ফেরাতে ইউনুসের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছেন।
তবে ঘটনা যাই হোক না কেন বাংলাদেশের রাজ্য রাজনীতিতে যে ইউনূস ঝড় আবারও টর্নেডো হয়ে ফিরছে তা বলাই বাহুল্য।












Discussion about this post