বাংলাদেশে নিযুক্ত চিনের রাষ্ট্রদূত ওয়া ওয়েনের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূ রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিনের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে, দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা উদ্বিগ্ন। এই প্রসঙ্গে দুটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য সরাসরি উদ্যেগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানান দেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। আর দ্বিতীয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথগ্রহণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি। চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বলেছে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলি যে বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করে। সেই সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, সামরিকবাহিনী কেনাকাটায় আমেরিকার কথা বিবেচনা করে। আমেরিকার বার্তা পরিষ্কার। মার্কিন রাষ্ট্রদূত যেমনটি জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশের সামরিক চাহিদা মেটাতে চিনের অস্ত্রের বিকল্প হিসেবে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলির তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহে আগ্রহী। বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটার ৭২ শতাংশ আসে চিন থেকে। কাজেই আমেরিকার বক্তব্য চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। অন্যান্য বাণিজ্যের দিকে তাকালে এ বছরে শুরুতেই বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ সম্পূরক শুল্ক বসা আমেরিকা। এটিকে ম্যানেজ করতে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি করে। এই চুক্তির মধ্যে রয়েছে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করা হবে। এর সঙ্গে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার কথাও রয়েছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে শুল্ক কমিয়ে আনলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি চিন থেকে আমদানি করার কৌশল হতে পারে। বাংলাদেশ চিন থেকে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। যা বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ। আমেরিকা থেকে আমদানি করা হয় দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এটি চিনের প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি অনুসারে আমেরিকা থেকে আমদানি বৃদ্ধি করলে চিন থেকে আমদানি অবসম্ভাবিভাবে হ্রাস করতে হবে। বিষয়টি যদি কেবল আমদানি রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এই নিয়ে এত বিশ্লেষণের প্রয়োজন হত না। এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট বাংলাদেশকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে টেনে নেওয়ার একটি কৌশল। যেমনটা আমেরিকা করছে মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে।
থাইল্যান্ডে ২০২৩ সালের নির্বাচনে মার্কিনপন্থী মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি বিজয়ী হয়। কিন্তু তারা সেনাবাহিনীর সমর্থন না পাওয়ায় সরকার গঠন করে পেউ থাই পার্টি। যাদের মূল নীতি ছিল থাইল্যান্ড ফার্স্ট। চিনের সমর্থন থাকায় এই দল ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশেও গত নির্বাচনে মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো ধারণা করেছিল, কিছুটা হলেও তারা নিশ্চিত ছিল যে জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু বিএনপি তাদের বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি নিয়ে সরকার গঠন করেছে। বলা হচ্ছে, বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে চিন। এখানে চিনা রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি আবার আলোচনায় চলে আসে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন তা খুব একটা নতুন বিষয় নয়। সেখানে কোনো কঠিনভাবে বার্তা দেয়ার মতো ভাষাও ছিল না। তবে এর স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা রয়েছে। কিন্তু সে হিসেবে চীনের প্রতিক্রিয়া বেশ কঠিন ছিল বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘আমরা তো জানিই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পরস্পরকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে” এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থান থেকে তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে।’ ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে সাম্প্রতিক কালে যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে তাঁরা বৈশ্বিক পরিসরে চীনকেই তাঁদের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করছেন। সুতরাং, নতুন যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর আলামত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, সেই নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রূপকল্পের ভালো-মন্দ আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিস্ময়কর হলেও লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের বামপন্থী, মধ্যপন্থী এবং ডানপন্থী, বিশেষত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নীরবতা পালন করে চলেছে।












Discussion about this post