ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাইছে আমেরিকা। মার্কিন স্বার্থেই তারা পূর্বতন তদারকি সরকার প্রধানকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চাইছে। পল কাপুর মার্চের শুরুতে ঢাকায় আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর আগামী ৩ মার্চ দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে আসছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর ওয়াশিংটন থেকে এটি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো দ্বিপক্ষীয় সফর। ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁদের আলোচ্যসূচির অন্যতম বিষয় ছিল পল কাপুরের আসন্ন ঢাকা সফর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত বৈঠকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং শান্তি ও উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ড. মুহাম্মদ ইউনুস যেন আচমকাই হারিয়ে গিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর কিছু পুরনো ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেই সব ছবি দিয়ে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশেই আছেন। এখানেই তিনি থাকবেন। আগামী সপ্তাহ থেকে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইউনূস সেন্টারের কাজ শুরু করবেন। সেখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত থ্রি জিরো ধারণা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাবেন।
রাজনৈতিকমহলের মতে, চিনকে গুরুত্ব না দেওয়ার রোডম্যাপ নিয়েও পল কাপুর ঢাকায় পা রাখতে চলেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সময় ঢাকা-ওয়াশিংটন অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে ঢাকা সফরে আসছেন পল কাপুর। ঢাকা ঘুরে তিনি যাবে দিল্লি। খলিলুর রহমানের নিয়োগ দেওয়াটা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে হয়। তিনি অন্তর্বতী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে সেই খলিলুরকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করায় এটি স্পষ্ট যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বৈদেশিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেই আলাপ আলোচনা আমেরিকা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গেও চালিয়ে যেতে চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে ইউরোপীয় জোটভুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে এক এক্স বার্তায় রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “মানবিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক সহায়তা কামনা করেন।”
পল কাপুর ঢাকায় আসছে এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকা একটি চুক্তি সই করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্ব ড. ইউনূসের নেতৃত্বকে কেন ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা মূলত নিম্নলিখিত কারণগুলো উল্লেখ করে থাকেন: ১. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ক্লিন ইমেজ ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজ এবং শীর্ষ নেতাদের কাছে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে। তাঁর এই আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি তাঁকে পশ্চিমাদের কাছে একটি আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে।
২. গণতান্ত্রিক সংস্কার ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল সেখানে এমন কেউ দায়িত্ব নিন যিনি নিরপেক্ষ। ড. ইউনূসকে তারা এমন একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে, যিনি দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, দুর্নীতি রোধ করতে এবং একটি অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন বলে তাদের বিশ্বাস ছিল।
৩. মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ড. ইউনূস মুক্তবাজার অর্থনীতি, সামাজিক ব্যবসা এবং ক্ষুদ্রঋণ মডেলের প্রবক্তা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর প্রশাসন মার্কিন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য অনেক বেশি উন্মুক্ত ও অনুকূল ছিল।
পল কাপুরের ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার অন্যতম কারণ আঞ্চলক ভারসাম্য বজায় রাখা। আর এই ভারসাম্য রক্ষার সহায়ক হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার একটা পরিকল্পনা চলছে।












Discussion about this post