প্রতিবেদন শুরু করা যাক প্রখ্যাত গীতিকার গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের লেখা একটি গান দিয়ে। গানটা লিখেছিলেন বাংলাদেশকে নিয়ে।
‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে / লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি/ আকাশে বাতাসে ওঠে রণি /বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’ ওই গানেই রয়েছে “ আবার এসে ফিরে যাবো /আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো ”। হারানো সেই বাংলাকে আবার তার আগের রূপে ফিরে পাওয়া যাবে কি না, সেই প্রশ্নটা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বিএনপির ক্ষমতায় আসীন হওয়া, সেই সঙ্গে তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠীত হওয়া। বাংলাদেশে গত ১৮ মাস ধরে চলছে এক বর্ণালী মুষলপর্ব। বর্ণালী বলতেই হয়। কারণ, বিগত এই সময়ে পদ্মাপারে এত নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে, যা এককথায় অবিশ্বাস্য। কী না হয়েছে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই দুঃশাসন পর্বের অবসান ঘটেছে ঠিকই। কিন্তু সেই লাখ টাকার প্রশ্নটার উত্তর এখনও পাওয়া যাচ্ছে না – হারিয়ে যাওয়া সোনার বাংলাকে আবার তার আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া যাবে কি? এই রকম দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকায় পৌঁছলেন মার্কিন দূত সামির পল কাপুর। প্রথমে তিনি দিল্লি যান। সেখান থেকে ঢাকায়। সফরের এই রেখচিত্র প্রথমেই বলে দিচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়া ভারত যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, সেটা আরও একবার প্রমাণিত হল। পল কাপুর ঢাকা থেকে ভারতে আসতে পারতেন। দিল্লিরশ্বরদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। দিল্লিতে পা রাখার প্রথম কারণ, ঢাকার ব্যাপারে দিল্লির মন পড়তে চেয়েছিলেন। দিল্লি এলেন এমন সময়ে যখন বিশ্বের একটি প্রান্তে চলছে মিসাইল হামলা পাল্টা হামলা। ফলে সাউথব্লকের মনপাঠ করার অত্যন্জ জরুরী ছিল পল কাপুরের। আর পল কাপুর ঢাকায় পৌঁছলেন আরও একটি বড়ো ঘটনার পর। বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তি করেছে। চুক্তিটি হয়েছে বিদায়ী সরকারের আমলে। তারেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে একটি শুভেচ্ছা চিঠি পাঠিয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটা শুভেচ্ছা চিঠি একেবারেই নয়। এটা হল হুকুমনামা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকা যে চুক্তি করেছে, সেই চুক্তি যাতে অক্ষরে অক্ষরে তারেক রহমান বাস্তবায়িত করেন, সেই বার্তা দিতেই হোয়াইট হাউজ থেকে ওই পত্রবোমা পাঠানো হয়েছে।
এবার আসা যাক সামির পল কাপুরের বিষয়ে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী। এবাদে তার আরও একটা পরিচয় আছে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পল কাপুর ঢাকা সফর বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি সদ্য সদ্য সরকার গঠন করেছে। তারেক সদ্য সদ্য প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই যে ট্রাম্পের দূত ঢাকায় পৌঁছেছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পল কাপুর মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান। তাঁর সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র পূর্ণিমা রায় জানিয়েছেন, পল কাপুরের সফরের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করা। সফরকালে তিনি নতুন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে (ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল) অভিন্ন স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। কাপুর যে পদে ছিলেন, সেই পদে আগে ছিলেন ডোনাল্ড লু। তিনি একজন বিতর্কিত পররাষ্ট্র কর্তা। প্রাক্তন এই মার্কিন শীর্ষকর্তার সঙ্গে হাসিনা সরকারের পদে পদে বিরোধ হচ্ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একটি পাকিস্তানে ইমরান সরকারের পতন, দ্বিতীয়টি বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতন।
একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, তারেকের সঙ্গে পল কাপুরের আলোচনার বিষয় থাকবে আওয়ামী লীগ। ফলে, তিনি কেন আগে দিল্লি এসেছিলেন, সেটা এখন স্পষ্ট। ভারত সরকারের তরফে তাঁকে এই বিষয়ে কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেকের সঙ্গে আলোচনার সময়ে তিনি যে অবশ্যই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিয়ে কথা বলেন। সফর তিন দিনের। সফরের শেষ দিনে পল কাপুর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। মার্কিন এই শীর্ষ কূটনীতিকের আগমনে দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেমন নতুন মাত্রা পাবে, তেমনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।












Discussion about this post