ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক একদিন আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ থেকে একজন বিশ্বস্ত অফিসার গেলেন বিজি প্রেসে। একটি বিশেষ আদেশ হাতে হাতে প্রিন্ট করে একটি মাত্র কপি নিয়ে আসেন। কী ছিল সেই অতি গোপনীয় গেজেটে? আর কেনই বা এটা নিয়ে এতো রাখঢাক? বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার ঠিক আগে নিজেকে এক বছরের জন্য ঘোষণা করলেন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভিভিআইপি। ওই গেজেটে বলা হয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন ২০২১-য়ের ধারা ২ (ক) অনুযায়ী এই মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিনি এক বছরের জন্য স্পেশ্যাল সিকিউরিটি ফোর্স এসএসএফের নিরাপত্তা পাবেন। গেজেটটি জারি করেন, তৎকালী প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লা পান্না। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দফতর থেকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোন ধরেননি।
ওই আইনের ২ (ক) ধারায় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের পাশাপাশি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ঘোষিত কোনও ব্যক্তিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী বিদায়ী সরকার প্রধানদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএসএফের নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। প্রজ্ঞাপন জারি হলেই তবে তা কার্যকর হয়। এই বিষয়ে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফকে সংবাদমাধ্যমের তরফে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ১০ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া গেজেটটি গভর্নমেন্ট প্রেসে মুদ্রিত হয়েছে ইউনূসের দফতর থেকে পাঠানো নথির ভিত্তিতে। তিনি বলেন, “ওটি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এসেছিল। তাদের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি। ”প্রশ্ন করা হয়, গেজেট ওয়েবসাইটে প্রকাশ না হলে তা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কি না, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কোন গেজেট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, আর কোনটি হবে না, সেই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দফতরের। অধ্যাপক ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, এসএসএফ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কোনও আইন লঙ্ঘন করেননি।
প্রশ্ন উঠছে, আইনগতভাবে ইউনূস কি এটা করতে পারেন? সংবিধান কি গেজেট জারি করার অধিকার দিয়েছে? গেজেট জারি করতে কি রাষ্ট্রপতির অনুমতির প্রয়োজন হয় না? রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কি জানতে এই গোপন পরিকল্পনার কথা? ড. ইউনূসের নিরাপত্তা এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল কেন? ক্ষমতা গ্রহণের আগে তাঁকে দেখা গিয়েছে নিজের হাতে নিজের গাড়ির দরজা লাগাতে। তা দেখে অনেকে বাহবা দিয়েছিলেন। ক্ষমতা ছাডার পরে তাঁর এসএসএফের প্রোটোকলের প্রয়োজন হয়ে পড়ল কেন? এটা কি ক্ষমতার সূক্ষ্ম অপব্যবহার?
১০ ফেব্রয়ারি, ২০২৬। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জারি করা হয় গেজেট। আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১। এই আইনের আওতায় ভিভিআইপি স্ট্যাটাস পেলে তিনি পাবেন ২৪ ঘণ্টা বিশেষ নিরাপত্তা এসএসএফ প্রোটোকল। বিমানবন্দরে ভিভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রোটোকল। প্রশ্ন হল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, যিনি নির্বাচিত নয়, বরং অস্থায়ী প্রশাসনক প্রধান, তাঁর জন্য এক বছরের ভিভিআইপি মর্যাদার কি স্বাভাবিক? গেজেট বলা হয়েছে – “এটা রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি হয়েছে।” ধরে নেওয়া যেতে পারে রাষ্ট্রপতি চুপ্পু এটা জানতেন। তাঁর অনুমোদনের পরেই এটি জারি করা হয়েছে। কিন্তু তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এটা নিয়ে এতো তাডা়হুড়ো কেন? এতো গোপনভাবে করা হল কেন? আরও বড়ো প্রশ্ন, যখন একজন ক্ষমতাধারী ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের জন্য নিশ্চিত করেন, তখন সেটিকে ‘conflict of interest’ বলা যাবে কি না?’
বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও ব্যবস্থাই নেই। ইউনূস সরকার গঠিত হয়েছে বিশেষ পরিস্থিতিতে, সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে। ঐতিহাসিকভাবে তত্ত্বাধায়ক সরকারের যে ধারণা, অর্থাৎ সংবিধানের সংশোধনী অনুসারে, সেই সরকারের কাজ নির্বাচন আয়োজন। নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইউনূস সরকারকে দেওয়া হয়নি। পূর্বতন সরকার বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। সেই বিতর্কের তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি।












Discussion about this post