সালটা, ২০২৫। দিনটি ছিল শনিবার। আর তারিখ ২৯ নভেম্বর। তারেক রহমান সেই সময় লন্ডনে। তিনি তখন বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান। ওই দিন সকালে তারেক জিয়া দেশে ফেরা নিয়ে তাঁর ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট করেছিলেন। পোস্টে তিনি লেখেন তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি শুধুমাত্র নিজের ওপর নির্ভর করছে না। তিনি কাদের অনুমতির অপেক্ষা করছেন বা কাদের আপত্তিতে তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না – এই বিষয়টি তারেক পোস্টে স্পষ্ট করেনি। তিনি বলেছেন সেই বিষয়টি স্পর্শকাতর। প্রকাশ্যে আলোচনা করা যাবে না।
সেই ঘটনার এক মাসের মধ্যে তিনি শুধু দেশে ফেরেননি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জটায়ুর ভাষায় ব্যাপারটা কিন্তু “হাইলি সাসপিশাস”। “হাইলি সাসপিশাস” বলতে হচ্ছে। তার কারণ সব কিছু কেমন যেন আশ্চর্যরকম মসৃণভাবে সম্পন্ন হল। আগে কারা বাধা দিয়েছিল, পরে তাঁরা কাকে দেশে নিয়ে গিয়ে একেবারে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসিয়ে দিলেন – সব কিছুই যেন “ডাল মে কুছ কালা হ্যায়”। অথবা “ইয়ে বাত কুছ হজম নেহি হুয়া”।
রাজনীতির এই জাদুকরি পরিবর্তনের নেপথ্যে যে আন্তর্জাতিক দাবার চাল ছিল, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলের এই নাটকীয়তায় যারা কলকাঠি নেড়েছেন, তারা কিন্তু এখন তাদের পাওনা বুঝে নিতে বাংলাদেশে আসছেন। দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। পল কাপুর যে পদে রয়েছেন, সেই পদে আগে ছিলেন ডোনাল্ড লু। তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। প্রথম অভিযোগ পাকিস্তানে ইমরান সরকারের পতনের মূল স্থপতি এই ডোনাল্ড লুর। পরে তিনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে উল্টে দেন। সেই বিতর্কের জেরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড লুরকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেন। নিয়োগ করেন পল কাপুরকে। আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ দ্বিপাক্ষিকসফর এবং প্রস্তুাবিত বৈঠকগুলি দ্বিপাক্ষিকস্তরের মনে হতে পারে। কিন্তু সফর এবং বৈঠক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই সফর আসলে মার্কিন হুকুমদারির বার্তা, যা আমেরিকা থেকে কাঁধে করে বহন করে এনেছেন পল কাপুর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমান আমেরিকাকে যে মুচলেকা দিয়ে দেশে ফিরেছেন, সেই সব মুচলেকার কতটা কার্যকর হয়েছে, তার হিসেব নিতে সুদূর ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ঢাকা এসেছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত।
পল কাপুর কিন্তু সরাসরি ঢাকা যাননি। তিনি প্রথমে দিল্লি পৌঁছান। সেখান থেকে ঢাকা। তার মানে ধরে নেওয়া যেতে পারে, সাউথব্লক থেকেও তাঁকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে, ওয়াশিংটন এবং দিল্লির বার্তা নিয়ে ঢাকায় গিয়েছেন তারেক। পল কাপুর কোনও সাধারণ কূটনীতিক নন। তাঁর ক্যারিয়ার এবং গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হল ইসলামি চরমপন্থার উত্থান ও বিস্তাররোধ। জঙ্গিবাদ নিয়ে তাঁর একাধিক বই রয়েছে। পল কাপুর মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে পাকিস্তান বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতা বা প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত জরুরী। এই প্রেক্ষাপটে পল কাপুরের ঢাকা সফর তারেক রহমান সরকারের জন্য একটি বড়ো পরীক্ষা। তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
অনেকেই মনে করছেন যে ২০২৪ সালে ডোনাল্ড লু যাদেরকে দিয়ে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করায় সফল হয়েছিলেন, তাঁদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি দেখানো গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে পল কাপুর সহ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই কাজ করেছেন। এই সব কিছুর সঙ্গে তারেক রহমানের দেশে ফেরা, একটি নির্বাচন, তারেকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া – একে অপরের সঙ্গে ভীষণভাবে সংযুক্ত। পল কাপুরের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির আগামীদিনের অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণে এখন দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য। এই দুই খাতের আড়ালে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে।












Discussion about this post