২০২৫-য়ের ২৮ অক্টোবর। তারিখটা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সোনার হরফে লেখা থাকবে। পদ্মাপারে সেই সময় ক্ষমতায় মুহাম্মদ ইউনূস। ওই দিন রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা যমুনায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি। তিনি ইউনূসের হাতে তুলে দেন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তাদের সুপারিশমালা সরকারপ্রধানের হাতে তুলে দেন। ইউনূস সেদিন বলেছিলেন, “আজকে একটি মহান ঐতিহাসিক দিবস। আমরা শুরু করেছিলাম অভ্যুত্থান। তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল জুলাই ঘোষণা। জুলাই ঘোষণার পরে জুলাই সনদ।” আবেগতাড়িত ইউনূস ওই দিন আরও বলেন, “আজকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন – এই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটা ঐতিহাসিক পরিবর্তন।” তিনি বলেন, “আজকে কমিশন আমাদের হাতে যেটা দেবে, সেটার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা যদি আমরা সঠিকভাবে পালন করতে পারি এবং কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ অতীত থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।”
বাংলাদেশ অতীত থেকে মুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। ভোটে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাদেশে চলতে শুরু করেছে গণতন্ত্রের রেলগাড়ি। আম আদমি এখন অনেকটাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। আর আদালতের গেড়োয় জুলাই সনদের গলায় পড়েছে ফাঁসির দড়ি। বাংলাদেশ হাইকোর্ট জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ, গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করল বাংলাদেশ হাইকোর্ট। রুল জারি করেছে বিচারপতি রাজিক আল জলিল এবং বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ।
২০২৪-য়েরক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতের আশ্রয় নেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। জুলাই লাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের সঙ্গে সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবের বিষয়ে গণভোট গ্রহণ করা হয়। এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয় বিএনপি। অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. রেদোয়ান-ই খোদা হাইকোর্টে একটি রিট করেন। অপর দিকে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম আর একটি রিট করেন। সেই রিটে তিনি জুলা জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যদের শপথের জন্য দেওয়া চিঠির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
বিএনপি কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। যে কারণে তারেক রহমানে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বয়কট করে এনসিপি। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছিলেন, – “বিএনপি গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ছিল এই জুলাই সনদের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে মামলা রুজু হতে পারে। তাদের আশঙ্কা সত্যিই হয়েছে। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানির সময় এজলাসে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম, সৈয়দ মামুন মাহবুব, গাজী কামরুল ইসলাম সজল ও জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন, জামাতের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। মামলার পরবর্তী শুনানি ঈদের পর।












Discussion about this post