ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা খামেইনির সঙ্গে একদিকে মিল আছে জামায়াতের ড. শফিকুর রহমানের। তাঁদের মতাদর্শের এক অনমীয় অবস্থান তাদের দুজনকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। আরও একজনকে নির্বাচনের জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিতে হয়েছে। ক্ষমতায় গেলে মহিলাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হবে, নারীরা কখন নেতৃত্বে যেতে পারবে না। নির্বাচনের আগে এই ধরনের কথা বলে বিতর্কিত হন জামায়াতের আমির। তাঁর কথায় নিন্দা জানায় অনেকে। কিন্তু জামায়াতে আমির তাঁর অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেল নারীদের নীরব ভোটে পরাজিত হয়েছে জামায়াত। ক্ষমতায় গিয়েছে বিএনপি। অথচ আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ভেবেছিল জামায়াত ক্ষমতায় যাচ্ছে। তারাই সরকার গঠন করবে। বিবিসি জানায়, আমেরিকা তাদের কূটনীতিককে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়েছিল। জামায়াতের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্বের হাত ইসলামের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়। বরং এর পিছনের কারণ বাংলাদেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন। যেটা তারা হাসিনার আমলে করতে পারেনি। আর পারেনি বলে হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। কাতার, ওমান, বাহরিনে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে আমেরিকা। এসব ঘাঁটি থেকে ফিলিস্তানিদের হত্যায় ইজরায়েলকে সাহায্য করে আমেরিকা। অভিযোগ তেমনই। এসব ঘাঁটি থেকে হামলা করে হত্যা করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা খামেইনিকে। দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের আধিপত্য মোকাবিলায় চিনের বন্ধু ভারত। বাংলাদেশে সেনাঘাঁটি তৈরি করতে পারলে চিনের পাশাপাশি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা তাদের প্রভাব খাটাতে পারবে। আমেরিকায় চায় বাংলাদেশে এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসুক, যারা আমেরিকার কথা শুনবে। সে জন্য তারা মনে প্রাণে চেয়েছিল জামায়াত ক্ষমতায় আসীন হোক। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে পশ্চিম দুনিয়ার যে কোনও কথা শুনতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল জামায়াত।
কিন্তু বাংলাদেশের ভোটাররা, বিশেষ করে নারী ভোটাররা দলটিকে হতাশ করে। দশকের পর দশক রাজনীতি করেও ইসলামী দলগুলি নারীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এই দলগুলির সঙ্গে অন্যদের মতবিরোধ তৈরি হয়। খামেইনির ইরানকে কিছুদিন আগেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০২২-য়ের সেপ্টেম্বরে ইরানের রাস্তায় ঠিকমতো হিজাব না পরার অপরাধে মাহাসা আমিনিকে ২২ বছরের তরুণীকে পিটিয়ে হত্যা করে ইরানের পুলিশ। এর প্রতিবাদে ইরানের লাখো তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে আসে। সেই আন্দোলনে ৬৮ জন শিশু সহ ৫৫১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। মানুষের ভিন্ন মত বা ভিন্ন রুচিকে স্বীকৃতি দেওয়া তো পরের কথা, সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনও দাবিতে আন্দোলনকে ইরানে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হয়।
এবছর শুরুর কথা বলা যাক। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে গুলি করে সারা দেশের মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দেন খামেইনি এবং তাঁর অনুগত সরকার। দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল দাবি করেছে ইরানের মানবিধাকার সংস্থাগুলি। এই কারণেই খামেইনির মৃত্যুর খবর শুনে শহরে দেখা গিয়েছিল বিজয়োল্লাস। তবে এখন পর্যন্ত সেই সব মানুষদের বেশি সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে না। ইরানে ইসলামি শাসন এখনও শেষ হয়নি। খামেইনি সহ বাহিনীর পরিচালনার শীর্ষ নেতৃত্বের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে ইরানের পরাজয় হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এখনও ইরানি পুলিশ ও সেনাবাহিনী সরকারের পক্ষেই আছে। জনগণের পক্ষে নেই। কাজেই দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে না। তবে রাস্তায় মানুষ না থাকলেও তারা সরকারের পক্ষে নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। সে কারণে সরকার টিকে রয়েছে। কিন্তু মানুষ যে সরকারের পক্ষে নেই, সেটা গত মাসের আন্দোলনেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশেও নির্বাচনের আগেও সামাজিক মাধ্যম সহ নির্বাচনী প্রচারের ধরন দেখে অনেকের মনে হয়েছিল ক্ষমতায় যাচ্ছে জামায়াত। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে তাদের সঙ্গে ছিল না, সেটা প্রমাণ হয়েছে ভোটের পর। না থাকার কারণ ইরানের সঙ্গে মিলে যায়। প্রশ্ন হল শফিকুরের পরিণতি কি খামেইনির মতো হবে?












Discussion about this post