একটি বাক্য আর একটি সাক্ষাৎকার। আর তা নিয়ে তোলপাড় বাংলাদেশ। জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্কের। রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য কি উগ্রবাদ বিরোধী অবস্থান? না কি নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বীকারোক্তি? রাজনীতিতে একটি বাক্যই আগুন ধরিয়ে দিতে পারে পুরো মাঠে। হঠাৎ একটি বাক্য সামনে চলে আসে।
তদারকি সরকারের এই সাবেক উপদেষ্টা বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকে মূল ধারায় আসতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “সমাজে একটি অংশ রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকতে পারে। তবে আমাদের কাজ ছিল যাতে মূল ধারার আসতে না পারে এবং সেই কাজটা আমরা করতে পেরেছি। ” রিজওয়ানা বলেন, “ অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশজুড়ে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন, মহিলাদের নিয়ে কটুক্তির ঘটনা সামনে আসে। ৫ অগাস্টের পর পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই চাপের ছিল। একদিকে ছিল বিশৃঙ্খলা। অপরদিকে আমাদের মূল্যবোধ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছি।”
নারী বিদ্বেষী বক্তব্যের প্রসঙ্গে তদারকি সরকারের এই সাবেক উপদেষ্টা বলেন, তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে এতটা নারীবিদ্বেষী ভাষা আগে শোনেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুধু নারী হওয়ার কারণে তাঁকে নানা আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে বলে তিনি ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। রিজওয়ানা আরও বলেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময়ের সময় নারীর প্রতি উগ্রবাদ ও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ ওঠে। উপস্থাপক জানতে চান – মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন ও নারীদের নিয়ে কটুক্তির ঘটনাগুলি তিনি কীভাবে দেখছেন? একই সঙ্গে অনেকেই এসব ঘটনায় উগ্রপন্থীদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন – এ কথাও প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়। জবাব দিতে গিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, নারীদের নিয়ে কটূক্তি করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নারী সমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছে, লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে এবং সরকারও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা পরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। তদারকি সরকারের প্রাক্তন এই উপদেষ্টা বলেন, “আমি বলেছি – যারা কটুক্তি করেছে, সেই উগ্রবাদী শক্তি যেন মূলধারায় প্রবেশ করতে না পারে। এই বিষয়ে নারী সমাজকে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ নারী সমাজই এসব শক্তিকে মেইনস্ট্রিম করতে দেয়নি। ”
বক্তব্যের ব্যাখ্যায় রিজওয়ানা বলেন, আলোচনার একপর্যায়ে উপস্থাপক নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুললে তিনি শুধু এতটুকু বলেন যে, বিরোধী দলের যেসব উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেসব বিষয়ে তারা কাজ করবেন। এরপর আবার মূল প্রশ্নে ফিরে গিয়ে তিনি উগ্রবাদ প্রসঙ্গেই কথা বলেন। সাবেক উপদেষ্টা বলেন, পুরো আলোচনায় তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি। কারণ, সেটি প্রাসঙ্গিক ছিল না। তবে তিনি এটাও বলেছেন, বিরোধী দল অবশ্যই গণতন্ত্রের মূল ধারার অংশ।
রিজওয়ানার এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে জামায়াত। দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের বলেছেন, রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য আসলে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইঙ্গিত। যদি কেউ বলেন রাজনৈতিক শক্তিকে মূল ধারায় আসতে দেওয়া হয়নি, তাহলে প্রশ্ন ওঠে কীভাবে তা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায় নির্বাচনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনও দলকে জয়ী করা বা পরাজিত করার কোনও পরিকল্পনা ছিল কি না? এখানে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ তাহেরের ভাষায় রিজওয়ানা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছেন। যদিও কোনও শক্তিকে রাজনীতির মূল ধারায় আসতে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত কি দলগত সিদ্ধান্ত? না কি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। না কি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত? না কি প্রশাসনিক প্রতিরোধের কথা?












Discussion about this post