অবশেষ ভারতের গ্রেফতার শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামী। ভারতেই তাদের রিম্যান্ড। তারপর খবর, তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। অপরদিকে এই গ্রেফতার ইস্যু নিয়ে শুরু হয়েছে নানা কাটাছেঁড়া। প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ হাদির খুনিদের কেন ফেরত দিচ্ছে ভারত? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গিয়ে এতবড়ো ঘটনা ঘটাবে ভারত? খোদ হাদির সমর্থেকরাও বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছে না। কী চলছে আসলে ভারতের মনে? শেখ হাসিনাকেও কি তবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে ভারত।
গত বছর ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডের জুম্মার নামাজ শেষে নির্বাচনী গণসংযোগ করার সময় শরিফ ওসমান হাদিকে খুব কাছ থেকে মাথা লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ঘটনাটি সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। গুরুতর আহত হাদিকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানকার একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যু হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে হাদির সমর্থকেরা প্রতিনিয়ত সরব ছিলেন ন্যায় বিচারের দাবিতে। অবাক করার মতো বিষয় হল, ঘটনার প্রায় তিন মাস পর ভারতের পশ্চিবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত থেকে যখন হাদি হত্যার মূল শুটার ফয়জল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়, তখন হাদির অনুসারীদের মধ্যে কিন্তু খুব একটা উল্লাস দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনকিলাবমঞ্চের প্রতিক্রিয়া বেশ ঠাণ্ডা এবং অনেকটাই নিষ্প্রভ। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, খুনিদের ধরা পড়ার খবরে যতটা স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করার কথা ছিল তা রহস্যজনক কারণে অনুপস্থিত। দীর্ঘদিনের একটি কাঙ্খিত খবর আসার পরেও এই নীরবতা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। অবশ্য এই গ্রেফতারের পিছনে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের একটি বড়ো ভূমিকা রয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। জানা গিয়েছে ডিজিএফআইয়ের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ভারত সফর করেন এবং সেখানে তিনি সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পেশ করে আসামীদের গ্রেফতারের জন্য জোরাল চাপ দেন। ফলশ্রুতিতে পশ্চিবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ ৭ এবং ৮ মার্চের মধ্যবর্তী রাতে অভিযান চালিয়ে হাদি হত্যার মূল ষড়যন্ত্রীকে গ্রেফতার করে। আপাতদৃষ্টিতে এটি দুই দেশের গোয়েন্দা এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একটি বড়ো সাফল্য। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছে, এই সাফল্যের পিছনেও রয়েছে রাজনীতির এক গভীর ও জটিল অঙ্ক।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারকে মসনদ থেকে নামানো বা অন্তত বেকায়দায় ফেলার অন্যতম হাতিয়ার বা ইস্যু হয়ে উঠেছিল এই হাদি হত্যাকাণ্ড। হাদির খুনিরা ধরা না পড়লে এই ইস্যুকে পুঁজি করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা যেত। রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠত। কিন্তু হঠাৎ করেই ভারতের তরফ থেকে খুনিদের গ্রেফতার ও বাংলাদেশে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে। রাজনৈতিকমহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এখন ভিন্ন তত্ত্ব। অনেকেই মনে করছেন বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে ভারতের পরোক্ষ সমর্থন বা প্রেসক্রিপশনে। রাজনীতিতে এমন একটি গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। ভারত কখনই চায় না তাদের আশীর্বাদপুষ্ট বা তাদের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতায় থাকা কোনও সরকার এই মুহূর্তে বড়ো কোনও সংকটে পড়ুক বা ক্ষমতাচ্যুত হোক। হাদি ইস্যুটিকে যদি দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা হত, তাহলে বর্তমান সরকারের জন্য ব্যুমেরাং হতে পারত। বিরোধীপক্ষ বা ইনকিলাব মঞ্চের মতো সরকার বিরোধী সংগঠনগুলি এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চাঙ্গা করার এক বিশাল সুযোগ পেত। তাই ভারত সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে হাদির খুনিদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত বুঝি আইনের শাসন বা ন্যায় বিচারের স্বার্থে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি অগাধ সম্মান দেখিয়ে এই কাজ করছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই খুনিদের ফেরত দিয়ে বিএনপি সরকারকে চাপ থেকে রক্ষা করছে। বিএনপি সরকারের মাথার ওপর থেকে বড়ো একটি চাপ সরিয়ে দিচ্ছে নয়াদিল্লি। বিশ্লেকেরা মনে করছে, হাদি হত্যা নিয়ে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছিল, এই দুইকে ফিরিয়ে দিয়ে ভারত সেই আগুনে জল ঢেলে দিল।












Discussion about this post