দেশে সরকার বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। রাজনীতির মানচিত্রও পাল্টে গিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর চেয়ার কিন্তু বদলায়নি। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রপতি কি থাকছেন? না কি সামনে বড়ো কোনও পরিবর্তন? গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিকমহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে? কারণ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি। সরকার গঠন করার পর থেকে অনেকের ধারণা ছিল। রাষ্ট্রপতির পদেও পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক সূত্র বলছে, আপাতত রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে কোনও আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক জল্পনা যতই থাকুক সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও নেই।
এর পিছনের বড়ো কারণ সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। অর্থাৎ আইনগতভাবে তিনি ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই পদে থাকতে পারেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে বা সংসদের মাধ্যমে তাকে অভিসংশন না করা হলে নতুন কাউকে এই পদে বসানোর কোনও সুযোগ নেই। অর্থাৎ রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকলেও সংবিধান বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। রাজনীতির গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর রাজনৈতিক অতীত নিয়েও চলছে আলোচনা। প্রথমেই মনে করিয়ে দেওয়া যাক রাষ্ট্রপতি ছাত্রজীবনে করতেন ছাত্র লীগ। তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়াশোনা শেষ করে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু প্রথমে কয়েকবছর সাংবাদিকতা করেন। এরপরে যোগ দেন সিভিল সার্ভিসে। বিচার ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে জেলা দায়রা জজ হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের প্রথম পর্যায় শেষ হয়। পরবর্তীকালে তিনি পাঁচ বছর কাজ করে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে। ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেন বাংলাশের রাষ্ট্রপতির। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেন ওবাইদুল কাদির, জাহাঙ্গির কবির নানক ও লিটন চৌধুরি। আইনের দিকে থেকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তিনি আওয়ামী লীগের মনোনিত। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাও বটে। আইনগতভাবে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বহাল থাকার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নেই। কিন্তু নীতি নৈতিককতার নিরিখে তাঁর অবস্থান কিছুটা দূর্বল করে দেয়। এই দূর্বল অবস্থান নিয়েই রাষ্ট্রপতি থেকে যেতে চান। সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিএনপি চাইলে তিনি থাকবেন। অর্থাৎ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এখন বিএনপিকে সার্ভ করতে চাইছেন। কিন্তু তিনি কি আসলে বিএনপিক সার্ভ করতে পারবেন? কারণ এই বিএনপিই তো ২০০১ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর বিএনপি সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই কমিটি বিএনপি নেতাদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল। এমনকী এর জন্য গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন তাহলে কীভাবে বিএনপির উপকার করবেন?
এই অবস্থায় বাংলাদেশে ঘটে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ২০২৪-য়ের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যূত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশজুড়ে তখন শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেই সময় অনেকে ধারণা করেছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেটি ঘটেনি। পরবর্তীতে একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় দাঁত কামড়ে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিএনপিও রাষ্ট্রপতি সরিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিল না। কারণ, সাহাবুদ্দিন চুপ্পকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারত। তাই, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁকে মসনদে বসে থাকতে দেওয়া হয়। এর পর নতুন একটি দৃশ্য সামনে আসে। রাষ্ট্রপতিকে দেখা যায় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে। এই ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটা কি রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ? না কি শুধুই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল? সমালোচকদের মতে পদ ধরে রাখার জন্যই কি এই ভোল বদল? অবশ্য রাষ্ট্রপতি এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি যদি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তিনি থেকে যাবেন। আর বিএনপি তাদের পছন্দমতো কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করলে তিনি চলে যাবেন। সামনে আসছে আরও একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত। ১২ মার্চ শুরু হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। প্রথম দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কথা। ভাষণের খসড়াও চুড়ান্ত। এনসিপি দাবি তুলেছে রাষ্ট্রপতিকে অভিসংশন করে গ্রেফতারের। জামাতের নীরব সমর্থন রয়েছে। বিএনপি অবশ্য এই সব দাবিকে আমল দিচ্ছে না।












Discussion about this post