Below the belt? না কি বেনজির সিদ্ধান্ত?
বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা। সাম্প্রতিক অতীত বললে ভুল হবে। ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ মনে করতে পারছেন না। হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহার বা বদলি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যে কায়দায় ব্রিটেনের বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাতে সকলেই হতভম্ব। হ-য-ব-র-ল-য়ের সেই বিখ্যাত সংলাপের উল্লেখ করতে হয় – ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমাল।
ঠিক কী হয়েছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যে দেশে রয়েছেন, সেই দেশে গিয়ে তাঁকে প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গত শনিবার তিনি লন্ডন পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে গিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। লন্ডন সফরের উদ্দেশ্য কমনওয়েলথ দিবস উদযাপন এবং কমনওয়েলথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়া। হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছলে সংবাদমামাধ্যমের প্রতিনিধিরা সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “কমনওয়েলথ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। ” এর পরেই তিনি বলেন, “শোনেন একটা সুখবর হইলো। হাইকমিশনার লন্ডনে এতোদিন ডিভাইসিস বিহেভিয়ারে-কন্ডাক্টে কমিউনিটি ডিভাইড করে রাখছে। সে আওয়ামীকরণ করছে হাইকমিশনকে, আওয়ামীকরণের ধান্দা নিয়া চলছে। কমিউনিটির ধান্দা নাই, বাংলাদেশের ইন্টারেস্ট দেখে না। এই হাইকমিশনারেক প্রত্যাহার করা হয়েছে। ” পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম হ্যাজ বিন রিমুভড ফ্রন হার পোস্ট।” প্রসঙ্গত তিনি যখন এই ঘোষণা করছেন, সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ তো বটেই অন্যান্য দেশেও হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে। সাবেক কুটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে গিয়ে এমন ঘোষণা সরকার ও দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশে ও বিদেশে কর্মরত পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সাধারণত রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার বা কূটনীতিকদের নিয়োগ ও তা পরিবর্তন করার একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি পরাষ্ট্র মন্ত্রক দপ্তরের মাধ্যমে আদেশ জারি করে নিয়োগ বা বদলি করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দেশে ফেরার সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু কূটনীতিকদের নিয়োগ ও তা পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার ব্যতয় ঘটিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের উপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর পরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার এমন ঘোষণা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রাক্তন একাধিক পররাষ্ট্রসচিব এই ঘোষণাকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এটি পেশাদার কূটনীতিকদের ভূল বার্তা দেবে। যুক্তরাজ্য বা হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে কোনও বার্তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আবিদা ইসলামের ব্রিটেনে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে মেক্সিকো এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের সূত্রগুলি বলছে, রবিবার লন্ডনে স্থানীয় সময় রাত ৯টায় কানাডার পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি রবার্ট ওলিপ্যান্টের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কর্মসূচি শুরু হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের এক কর্মকর্তা বলেন, ফরেন সার্ভিসের পেশাদার কূটনীতিকদের জন্য এই ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকটাই বিরল। এই ঘটনায় তাদের মধ্যে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। প্রাক্তন কূটনীতিকরা বলছেন, সরকারি সফরে গিয়ে নিজের দেশের হাইকমিশনারকে এভাবে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তাঁকে যেমন অসম্মানিত করা হয়েছে, তেমনই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রূদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন “ কিন্তু প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত যেভাবে হয়েছে, সেটি যৌক্তিক নয়। এতে শুধু হাইকমিশনারকেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়নি, এতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষু্ণ্ণ হয়েছে। এগুলো আগামীদিনে যারা পেশাদার কূটনীতিতে আসবেন, তাদের নিরুৎসাহিত করে।”
আরও এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ জানিয়েছেন, “এভাবে একজন হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের ও দেশের মুখ উজ্জ্বল হয়নি। ”












Discussion about this post