শেখ হাসিনার বিচার করতে অন্তবর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আইন পরিবর্তন করেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর হিসেব নিয়োগ করে তাজুল ইসালমকে। তিনি জামায়াতপন্থী আইনজীবী বলেই সুবিদিত। সেই ট্রাইব্যুলে যে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছিল, সরকার বদল হতেই সেই সব দুর্নীতির বেড়াল ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই জামায়াতপন্থী আইনজীবীকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেন। এই অপসারণ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে দুর্নীতির, কুকীর্তির সব তথ্য সরকারের হাতে চলে এসেছে। বিএনপি বা জামায়াতকে কিন্তু এই রদবদল নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই দুই দল নিশ্চিত যে আইসিটিতে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, তার নথিপত্র তারেক সরকারের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। বিএনপি এবং জামায়াতের কাছে আইসিটি একটা অস্ত্র হয়ে উঠেছিল, যে অস্ত্রে তাঁরা শান দিয়ে তাদের বিরুদ্ধবাদীদের কণ্ঠরোধ করা। তাজুলের প্রসিকিউশন টিমের এক সদস্য সুলতান মামুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সবিস্তারে তুলে ধরেন আইসিটিতে রাজসাক্ষী করা ছিল এক ধরনের ব্যবসা। মোটা টাকার বিনিময়ে আসামী রাজসাক্ষী সাজিয়ে দেওয়া হত।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একটি পোস্ট করেন। পোস্টের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তাকে রাজসাক্ষী করা হয়েছিল। ফেসবুকের পোস্টে ওই আইনজীবীর শিরোনাম দেন “ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে।” ওই পোস্টে তিনি “প্রসিকিউশন টিমের একটি প্রভাবশালী অংশ গোপন সমঝোতা বা সেটলিং বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে ” বলে অভিযোগ করা হয়। তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে আরও কিছু তথ্য তুলে ধরেন অন্যান্য আইনজীবী। তাদের মধ্যে একজন ট্রাইব্যুনালেরই প্রসিকিউশন টিমের সদস্য অ্যাডভোকেট বিএম সুলতান মামুদ। মামুদ বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমি দীর্ঘদিন প্রসিকিউসন টিমে কাজ করছি। সেই কাজের সুবাদে বলছি, শুধু আইজিপি মামুন নয়, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আফজালকে রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিন-চারজনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই জড়িত। ধানমন্ডী তদন্ত সংস্থায় বসে প্রাক্তন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির সিন্ডিকেট প্রাক্তন আইজি মামুনকে রাজসাক্ষীর নাটক বানায়। প্রাক্তন আইজিপি মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ধানমন্ডি সংস্থায় আনলে সেখানে শিশির মনির হাজির থাকতেন। তারা দাগি খুনি পুলিশকর্তাদের গ্রেফতার না করে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে তাজুল সিন্ডিকেট। ”
এখানেই শেষ নয়। সুলতান মামুদ আরও বলেন, “ গত বছর নভেম্বরের শেষের দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় আসামি আফজালের বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের রুমে প্রবেশ করেন। বিষয়টি আমরা দেখার পরে পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। এই ঘটনায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টে আমাদের বকাঝকা করা হয়েছে। তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার করে যে আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামীর বউ কেন তাঁর রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হল। চূড়ান্ত বিচারে তাঁকে খালাস দেওয়া হল। ”
এই প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিতে চিঠিও দিয়েছিলেন তাজুল ইসলাম। সেই সময় বাংলাদেশে ক্ষমতায় তদারকি সরকার। অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনার বিচার করতে তদারকি সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেই অধ্যাদেশের বৈধতা নেই বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। আর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাজুল বলেন, “এই সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে ও বানোয়াট। কেউ ব্যক্তি চরিত্র চরিতার্থ করতে চাইলে বিষয়টি দুঃখজনক। এখানে স্বচ্ছভাবে বিচার হচ্ছে এবং তা ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে। ”
তাজুলের এই বক্তব্য শোনার পর একটাই প্রশ্ন ওঠে – গোয়ালা কি বলে তার দুধে জল মেশানো আছে।












Discussion about this post