পদ্মাপারে পালাবদলের হাত ধরে আমূল বদলে গেল দিল্লি-ঢাকা কূটনৈতিক সম্পর্ক। বলা যেতে পারে, সম্পর্ক এক অন্য মাত্রা পেল। তবে সলতে পাকানো পর্বটা শুরু হয়েছিল জিয়ার অন্ত্যেষ্টিতে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করকে পাঠানোর মধ্যে দিয়ে। আমরা সকলেই জানিয়ে, জিয়ার প্রয়াণের পর সাউথব্লক থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল ভারতের বিদেশমন্ত্রীকে। সেই সময় কিন্তু বাংলাদেশে ছিল একটি অন্তর্বর্তী সরকার। জয়শঙ্করের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল ইউনূসের। সাউথব্লক সুকৌশলে তাঁকে এড়িয়ে গিয়েছে। সাউথব্লক ধরেই নিয়েছিল, পদ্মাপের হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার কোনও সম্ভাবনা নেই। মসনদে বসতে চলেছেন তারেক। তিনিই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। জিয়া বা বিএনপিকে ভারতপন্থী বলা যেতে পারে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলতে হবে। এটাই দস্তুর। সে কারণে জিয়ার অন্ত্যেষ্টিতে পাঠানো হয়েছিল ভারতের বিদেশমন্ত্রীকে। এর আরও একটা কারণ, ডিপ স্টেট যাতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ওপর আধিপত্যকায়েম করতে না পারে, তার জন্য আগে থেকেই জমি তৈরি করে রাখা দরকার। আর ইউনূসের সঙ্গে দেখা না করার কারণ, তিনি একটি অবৈধ সরকারের প্রধান। যে সরকারের কোনও সাংবিধানিক বৈধতা নেই। আর দ্বিতীয় কারণ, ইউনূস বকলমে মার্কিন প্রতিনিধি। সুতরাং যার জন্য হাসিনা ক্ষমতাচ্যূত হয়েছেন, তার সঙ্গে যে এক পংক্তিতে খাওয়া যায় না, সেটা স্পষ্টভাবে জানাতেই জয়শঙ্কর ঢাকায় পা রাখার পরেও তদারকি সরকার প্রধানের সঙ্গে দেখা করেননি। তারেক তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদিকে। তিনি ব্যস্ত থাকায় ঢাকায় তারেকের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির থাকা সম্ভব হয়নি। পরিবর্তে গিয়েছিলেন আমাদের স্পিকার ওম বিড়লা এবং বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি। বলা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিতে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে বৃত্ত আঁকা শুরু হয়েছিল, বেগম পুত্রি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিড়লা এবং মিস্রিকে পাঠানোর মধ্যে দিয়ে সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হল।
যে প্রশ্ন এখন সাউথ ব্লক এবং বারিধারায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্ন দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক আগামীদিনে কোন খাতে বইবে। হাসিনার আমলে সম্পর্ক যতটা হার্দিক ছিল, তেমন হার্দিক থাকবে ? না কি কূটনৈতিক সম্পর্ক বলতে চড়া দাগে যা বোঝায়, সেই রকম থাকবে? কেমন হবে, তার একটা ইঙ্গিত কিন্তু আগাম দিয়ে রেখেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। সেই ইঙ্গিত বলে দিচ্ছে, কূটনৈতিক সম্পর্ক হার্দিক হবে। মির্জা ফখরুল বলেন, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক কোনও একটি বিষয়ের মধ্যে আটকে থাকবে না। হাসিনার ভারতে সাময়িক আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি বৃহত্তর পরিসরে দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও বাধা হয়ে উঠবে না। দিল্লি-ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একেবারে সমস্যাহীন, সেটা কিন্তু বলতে চাইছেন না তিনি। তবে সেই সব সমস্যা আলোচনার মধ্যে দিয়ে মিটিয়ে নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। যার অর্থ দাঁড়ায় সাউথব্লক যেমন বারিধারাকে নিয়ে আগামীদিনে চলতে চায়, বারিধারাও সাউথব্লকে সঙ্গে নিয়ে চলতে যায়।
ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির এই শীর্ষনেতার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে বিএনপি তাদের অতীতের ভাবমূর্তির বদল ঘটাতে চাইছে। তাদের মসনদে বসার অর্থ এই নয় যে ভারতের ব্যাপারে বৈরি মনোভাব নিয়ে চলা। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য, বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য যে সব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কও বৃদ্ধি করতে চান তাঁরা। এই প্রসঙ্গে তিনি চিন-মার্কিন সম্পর্কের উল্লেখ করেন। বিএনপির এই শীর্ষনেতা বলেন, “আমেরিকার সঙ্গে চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তবু তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও আমাদের শুধু একটি বিষয়ের মধ্যে আটকে রাখা উচিত নয়।” বিএনপি যে তাদের অতীতের ভাবমূর্তি বদলাতে বদ্ধপরিকর তার অন্যতম বড়ো প্রমাণ তারেকের মন্ত্রিসভা এক হিন্দু নেতার অন্তর্ভুক্তি। তারেক তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন নিতাই রায় চৌধুরী নামে এক প্রবীণ নেতাকে। তাঁকে মন্ত্রী করে জিয়া-পুত্র এই বার্তা দিতে চেয়েছেন, যে মুসলিম সংখ্যালঘু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে এই অন্তর্ভুক্তি। এরশাদের আমলেও তাঁকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। তিনি যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন। চৌধুরীর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি প্রতীকী ও রাজনৈতিক গুরত্ব বহন করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছানোর একটি বার্তা দেয়। তারা নিজেদের এখনও প্রান্তিক বোধ করেন। চৌধুরীর পাশাপাশি বৌদ্ধ চাকমা জনগোষ্ঠীর নেতা দীপেন দেওয়ানকেও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে।












Discussion about this post