বাংলাদেশে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। ফলাফলও ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াত। বিএনপির প্রাপ্ত আসন ২১২। অপর দিকে জামায়াতে ইসলামির ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আটটি আসনে জয়ী হয়েছে। শুক্রবার নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোটে বাংলাদেশের ৬০. ২৬ শতাংশ ভোটার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। রুমিন ফারহানা, নাহিদ ইসলাম, ফজলুর রহমান, নুরুল হক নুর, হাসনাত আবদুল্লাহ, হান্নান মাসউদসহ কয়েকজন জিতলেও ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসনে নির্বাচন করা নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, তাসনিম জারা ও মামুনুল হক এবং পঞ্চগড়ে সারজিস আলম শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীদের কাছে হেরে গেছেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির শীর্ষ তিন নেতা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। তবে হেরে গেছেন জাতীয় পার্টির জিএম কাদের ও ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসা কৃষ্ণ নন্দী হেরে গেছেন বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খানের কাছে। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন নির্বাচনে জিতলেও হেরে গেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারি। ওদিকে জেলা হিসেবে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।
এখনও সরকার গঠিত না হওয়ায় নানা প্রান্তে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। সরকার গঠনে অযথা কালক্ষেপ করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ শূন্যতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় power vacuum বা ক্ষমতার শূন্যতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশি হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি। আর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হচ্ছে আগামী কাল, অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি। গেজেট প্রকাশের চারদিনের মাথায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিতে চলেছেন । মাঝখানে চারদিনের ব্যবধান কেন, তা নিয়ে প্রশাসন থেকে কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। না কি সংবিধানের অন্তর্নিহিত চেতনার ভূল ব্যাখ্যা? এই বিলম্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা ফারায়াজি জানিয়েছেন, সংবিধান কোনও স্থবির বই নয়, একটি একটি জীবন্ত দলিল। জনগণের রায়কে দ্রুততম সময়ে আইনি বৈধতা দিয়ে সরকার গঠন করা। একটি বিদায়ী সরকারেরর কার্যকারিতা খুবই সীমিত। সেই সরকারের কাজ অনেকটা গতানুগতিক। প্রতিবেশি দেশ কোনও কৌশলি পদক্ষেপ নিলে তার মোকাবিলা করার মতো পূর্ণাঙ্গ শক্তি সেই সরকারের থাকে না। শহীদুল্লাহ ফারায়েজি তাঁর নিবন্ধে জানিয়েছেন, এই শূন্য অবস্থায় সরকার বিরোধী শক্তি রীতিমতো সক্রিয় থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও কিন্তু আশ্চর্যরকমভাবে নিশ্চুপ। তাদের তরফ থেকে বিএনপিকে সরকার গঠনের জন্য কোনওরকম চাপ দিতে দেখা যাচ্ছে না।
শহীদুল্লা ফারায়াজি বলেছেন, এই অভিভাবকহীন মুহুর্ত ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। নির্বাচিত সরকারের শপথের অভাবে দায়িত্ব নিতে পারছে না। আর বিদায়ী সরকার ক্ষমতা হারিয়ে কার্যত নিশ্চুপ। মাঝ বরাবর যে ধুসর এলাকা রয়েছে, সেটা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে। সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, শপথগ্রহণ কোনও সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি সরকার গঠনের প্রথম অপরিহার্য ধাপ। এটি একটি সাংবিধানিক নিরাপত্তার কবচ রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে স্পিকার যদি অনুপস্থিত থাকেন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য শপথবাক্য পাঠ করাতে দেরি করেন, সে ক্ষেত্রে দায় বর্তায় নির্বাচন কমিশনের ওপর। সংবিধানের চেতনা হল রাষ্ট্র এক মুহূর্তের জন্য অভিভাবকহীন থাকবে না। আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা এখানে সেই সংবিধানের গতিশীল চরিত্র বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। গেজেট প্রকাশের ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। এই দেরি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপক্কতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, স্পিকার তো আছেন। সে ক্ষেত্রে দেরির জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে দায়ী করা হচ্ছে কেন? ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, অনেক সময় বিদায়ী স্পিকার দলীয় সংকীর্নতা থেকে বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকেন। যাকে বলা হয় রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত। সংবিধান প্রণেতার এই সংকট অনুমান করেছিলেন বলেই তারা একটি বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভেবে রেখেছিলেন। সে কারণে তারা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে দিয়ে শপথবাক্য পাঠের প্রস্তাব রেখেছিলেন।












Discussion about this post