‘প্রথম রাতেই বেড়াল মারা’র কথা আমরা কমবেশি অনেকেই শুনেছি।
এটি একটি রূপক, যার অর্থ শুরুতে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিয়ে বা ‘ভয়’ দেখিয়ে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা। জুলাই সনদ নিয়ে তারেক রহমান যা করলেন সেটা অনেকটাই প্রথম রাতে বেড়াল মারার সমতুল। তিনি যে পদক্ষেপটি করেছেন, সেটা পোড় খাওয়া কোনও নেতার পক্ষেই নেওয়া সম্ভব। তারেক রহমানরা সংবিধান সংসদ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিএনপি চেয়ারম্যানের পরামর্শ মেনে দলের প্রবীণ নেতা তথা স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তাঁরা কোনওভাবেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। কারণ, বিষয়টি সংবিধানে নেই। গণভোটও সংবিধানে নেই। জামায়াতে ইসলামি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি ইউনুস সরকারের নামে যারা প্রকৃতপক্ষে জুলাই-অগাস্টের পর থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাঁদেরকে ক্ষমতার মঞ্চ থেকে না সরালে যে কোনওভাবেই সরকার চালানো যাবে না, সেটা তারেক রহমানের বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি। অথচ এই উপলব্ধি বা অনুমান করা একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যিনি রাজনীতির আগুন থেকে ওম নিয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামি প্রথম থেকে একটা পর একটা আবোল-তাবোল দাবি করে এসেছিল। কার্যত তারা ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে। তারেক রহমান যে বার্তা দিলেন, তা হল তথাকথিত এই জুলাই যোদ্ধাদের ব্ল্যাকমেলের রাজনীতির কাছে মাথা নত করবেন না। আলী রিয়াজ এবং তাঁর গোষ্ঠীর লোকেরা যেটা করেছে, সেটা বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের মানমর্যাদাকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। প্রতিটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাসকেদর প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হল সংবিধান রচনা করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার অন্যথা হয়নি। কিন্তু এই জুলাই যোদ্ধারা বাংলাদেশের সংবিধানটাই বদলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। বলা ভাল সংবিধান তুলে দেওয়ার একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। দরকার ছিল একটি নির্বাচিত সরকারের হাত দিয়ে সেটিকে আইনি বৈধতা দেওয়া। জল হাওয়ায় কীটদষ্ট হওয়া জুলাই সনদ নামের একটি কাগজকে সংবিধানের বিকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তারেক রহমান ভিনদেশের নাগরিক হলেও তাঁর মা ভিনদেশের নাগরিক ছিলেন না। তাই, যে আপোসহীন মায়ের গর্ভস্থ সন্তান যে এই জুলাই বিপ্লবীদের দাবির কাছে কোনওভাবেই মাথা নত করবেন না, সেটা জুলাই সনদের শিল্পীরা বিন্দুমাত্র অনুমান করেনি। কারণ, এটা তাদের কাছে ছিল বেশ কষ্টকল্পিত স্বপ্ন। কিন্তু তারেক রহমান সেটাই করেছেন। তারেক রহমানের বিন্দুমাত্র বুঝতে অসুবিধে হয়নি, যে জুলাই সনদ আসলে একটা অক্টোপাস। সেই অক্টোপাসের নাগপাশে একবার জড়িয়ে পড়লে সেখানে থেকে যে কোনওভাবেই বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়, সেটা বেগম জিয়ার পুত্রের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। বিএনপি আসলে একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। জামায়াতে ইসলামি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকে সংসদে যেতে হবে অনেকটা ভিজে বেড়ালের মতো। গত ১৮ মাসে তাদের দাপট বাংলাদেশ দেখেছে। অনেকে বলছে, এই জামায়াত আর জাতীয় নাগরিক পার্টির কোনওভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বাংলাদেশের সংবিধান তো পদ্মাপারে ফেলে দিত। পারলে দেশটার নামটাই হয়তো বদলে দিতে। এখন সংবিধানে বা দেশের জন্য তাদের কিছু করতে হলে সংসদের মাধ্যমে করতে হবে। মবক্র্যাসি করে আর তারা কিছু করতে পারবে না। তারা এটাও এখন বুঝতে পারছে, এই চক্রান্ত করে এই সরকারকে তারা কোনওভাবেই ফেলতে পারবে না। কারণ, এই সরকারের পিছনে ভারত এবং আমেরিকার মতো দুটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের অদৃশ্য আশীর্বাদ রয়েছে। তাই আপাতত তাদের শাসনক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার কথা ভুলে যেতে হবে। তারা যাতে মাথা নত করে সংসদে ঢোকেন, তার পাকা ব্যবস্থা করে ফেলেছেন তারেক রহমান। অনেকে এখন প্রশ্ন করছেন দেশে ফিরে তারেক রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন – I have a plan. পাশাপাশি মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে তিনি কিছু কথা বলেছিলেন। সেই কথার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় সবার আগে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন না। আর সেটা ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল।












Discussion about this post