পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে বেশ কয়েক মাস ধরে চলছিল ঠাণ্ডা লড়াই। হঠাইৎ যুদ্ধ ঘোষণা করে দু’পক্ষ একেক দিন বিরাট সংখ্যা হতাহতের খবর নিয়ে চলছে চাপানউতোর। পাকিস্তান উপমহাদেশের যুদ্ধবাজ দেশ বলে পরিচিত। এতোদিন আফনিস্তানের তালেবান জঙ্গিদের পাকিস্তান ব্যবহার করেছে। আর এখন ক্ষমতাসীন তালেবানদের সঙ্গে তাদের স্বার্থের সংঘাত দেখা দিয়েছে। মূলত বালুচিস্তানকে কেন্দ্র করে। আর ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের বন্ধুত্বের কারণেই। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে পাকিস্তান ভেঙে যায়। ৭১-য়ের যুদ্ধ তার প্রমাণ। আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান কি আবার ভাঙতে চলেছে?
বাংলাদেশ আর বালুচিস্তানের মধ্যে দূরত্ব মাত্র দুই হাজার কিলোমিটার। পূর্ব পাকিস্তান আর বালুচিস্তান বলে আলাদা কিছু ছিল না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে পঞ্জাবের প্রভাবের বিপরীতে উভয় অঞ্চল নিজেদের এক এবং অভিন্ন বলে মনে করত। মূলত স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি, বালুচ এবং বাঙালিদের রাজনৈতিকভাবে কাছাকাছি নিয়ে আসে ১৯৫০-য়ের পর থেকে। এই দাবি মোকাবিলায় পাকিস্তানের শাসকেরা দুই অংশে দুই কৌশল নেয়। তার একটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানকে সংঘবদ্ধ করতে সেখানকার চার প্রদেশকে প্রশাসনিকভাবে এক ইউনিট করা, যা পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে আরও একটি ইউনিট। সেটা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্ব আর পশ্চিম মিলে একটি পাকিস্তান। এটা হয় ১৯৫৫ সালে। মসনদে তখন সিকন্দর মির্জা থাকলেও পর্দার আড়ালে ক্ষমতা ছিল সামরিক এবং বেসামরিক আমলাদের হাতে। ওয়ান ইউনিট ফর্মুলা ছিল সিন্ধি, পাস্তু, বালুচদের ভাষা এবং সংস্কৃতির ফারাক মুছে সবাইকে পাকিস্তানী বানাতে চেয়েছিল। তার সামান্যই তারা কার্যকর করতে সক্ষম হয়। ওয়ান ইউনিট নীতির ১৫ বছর পর পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। সিকন্দর মির্জা, আয়ুব খান, ইয়া ইয়া খান পূর্ব ভূখণ্ডের সায়ত্বশাসনের দাবি মোকাবিলা করতে গিয়ে কার্যত তাদের স্বাধীনতার পথে ঠেলে দেন। পশ্চিম পাকিস্তানেও এক ইউনিট কৌশল কাজে আসেনি। তার প্রমাণ ৭০ বছর পর এবার নতুন করে ইসলামাবাদের শাসনের বিরুদ্ধে বালুচদের প্রদেশজুড়ে চলমান বিদ্রোহ। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই দুই অধ্যায়কে মিলিয়ে পাঠ করলে কার্ল মার্কসের ১৮৫২ সালের সেই উক্তির কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ইতিহাসের অনেক সময় পুনরাবৃত্তি ঘটে। কখনও ট্র্যাজেডি আকারে, কখনও প্রহসনরূপে।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং কান্দাহার শহরে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। পরে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করে সামাজিকমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়েছেন। খবর আল জাজিরার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি এক্স পোস্টে জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ১৩৩ জন আফগান তালেবান নিহত হয়েছে এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। শুক্রবার ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে খাজা মোহাম্মদ আসিফ পোস্টে লেখেন, পাকিস্তান সরাসরি ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও লেখেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। এখন এখন তোমাদের সঙ্গে আমাদের প্রকাশ্য যুদ্ধ।’ কাবুলে আল–জাজিরার সংবাদদাতা নাসের শাদিদ জানান, আজ স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে কাবুলে বোমা ফেলেছে পাকিস্তানি বাহিনী। পরে আবারও বোমা ফেলা হয়। তবে প্রাথমিকভাবে এখনো হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত আফগান তালেবানের ২৭টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে।তিনি আরও জানান, এই অভিযানে তালেবানের ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান এবং অস্ত্রধারী সৈন্যবাহী যান (এপিসি) ধ্বংস করা হয়েছে।
পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়েছিলেন আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। তবে এখন তাঁর সেই পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আফগান বাহিনী পাকিস্তান সীমান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে দুই সেনা নিহত হওয়ার খবর জানায় ইসলামাবাদ। জবাবে গতরাতে কাবুল–কান্দাহারে হামলা চালায় পাকিস্তান। পরে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়েছেন। পরে আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক্সে দেওয়া পোস্টে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেন।
পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বলেছে, আফগানিস্তান কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই দেশটিতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা কাবুল ও কান্দাহারসহ একাধিক শহরে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এদিকে আফগান তালেবান বলেছে, সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের চালানো হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা গতকাল ‘বড় পরিসরে’ সামরিক অভিযান শুরু করেছে।












Discussion about this post