বাংলাদেশ মহাসাগরের অবিভাবক! নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান। যিনি সম্প্রতি চিন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি একটি অনুষ্ঠানে চিনের বাণিজ্যমহলকে আকর্ষিত করতে এ হেন বক্তব্য রেখেছিলেন। চিনের বাণিকদের বাংলাদেশে ডেকে আনতে তিনি ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকেও উপেক্ষা করতে ছাড়লেন না। চিনকে বাংলাদেশের বন্দর দান করতে তিনি ভারতের সাতটি রাজ্যের প্রসঙ্গও তুলে আনলেন। যে সেভেন সিস্টার্স ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বর্তমানে ভারত সরকার আর এটাকে সেভেন সিস্টার্স বলে না, বরং ডাকা হয় অষ্টলক্ষ্ণী নামে। কারণ, উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে এখন সিকিম যুক্ত হয়েছে। ফলে আটটি রাজ্য বা অষ্টলক্ষ্মী।
মুহাম্মদ ইউনূসের এই বক্তব্যের পর ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ এই বক্তব্যে রেগে কাঁই, কেউ আবার হেসে কুটিপাটি। একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, যিনি আবার এখন একটি রাষ্ট্রের অস্থায়ী প্রধান, তিনি কিভাবে এরকম বক্তব্য রাখেন সেটা ভেবেই অস্থির কূটনৈতিক মহল। মুহাম্মদ ইউনূস চিনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে তাঁর প্রেস সচিব দাবি করেছিলেন বাংলাদেশ ভারত সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটা বৈঠকের আয়োজন করতে। কিন্তু ভারত এর কোনও উত্তর দেয়নি। এমনকি থাইল্যান্ডে আসন্ন বিমসটেকের সম্মেলনের ফাঁকে যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আর্জি জানানো হয়েছিল সেটাও কার্যত খারিজ করে দিয়েছে ভারত। অর্থাৎ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে রাজি নন। আর তিনি যে কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে অনেকটাই দক্ষ, সেটা প্রমান হচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের চিনে দেওয়া এই বক্তৃতায়।
বেজিংয়ে দেওয়া ওই বক্তৃতায় মুহাম্মদ ইউনূস ফের একবার ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে কার্যত হুমকি দিলেন। তাঁর দাবি, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের ওই সাতটি রাজ্য ল্যান্ডলক, বা ভূমি দ্বারা পরিবৃত্ত। সেই সঙ্গে তাঁর দাবি, বাংলাদেশ এখন মহাসমুদ্রের অবিভাবক বা রাজা। ফলে তিনি চিনকে আহ্বান করেন তাঁর অঞ্চল যেন প্রসারিত করে। এই বক্তব্যের অর্থ হল, চিন যেন ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা সাতটি রাজ্য যেন দখল নেয়। আর বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে সমুদ্র বন্দরের সুবিধা নেয়। কারণ, বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলি, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে হলে চিনকে ভারতের সাতটি রাজ্য অতিক্রম করতে হবে, নতুবা মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে হবে। এই মুহূর্তে যা কোনওটাই সম্ভব নয়। তাহলে কেন এ কথা বললেন ইউনূস?
ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, ইউনূস জানেন তিনি বেশিদিন প্রধান উপদেষ্টা থাকতে পারবেন না। কারণ, তিনি মার্কিন ডিপ স্টেট এবং পাকিস্তানের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছেন। আসলে তিনি একজন কর্মচারি। ফলে যতক্ষণ না তাঁর কাজ শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি পাকিস্তানের স্বার্থ দেখে যাবেন। যদিও ইউনুসের চিন ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার জন্য কিছুটা হলেও চিন্তার। এ ক্ষেত্রে উল্লেথ করা যায়, সম্প্রতি মার্কিন সেনার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের ডেপুটি কমান্ডিং জেনারেল জোয়েল পি ভোয়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের যে বৈঠক হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশের সামরিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়। তারপরেই আমেরিকার তরফে বাংলাদেশ সেনাকে সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী চিনও চায় প্রতিবেশী বাংলাদেশকে নিজেদের ‘হাতের পুতুল’ করে রাখতে। যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহজে বাংলাদেশকে বাগে আনতে না পারে। আবার সে কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সেনাকে সাহায্যের অঙ্গীকার করে, সে দেশের সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন সেনার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের ডেপুটি কমান্ডিং জেনারেল জোয়েল পি ভোয়েল আচমকাই ঢাকায় পদার্পন করেছিলেন ইউনূসের চিন সফরের কয়েক ঘণ্টা আগে। তিনি কেবলমাত্র বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গেই বৈঠক করেন।
সূত্রের খবর, মার্কিন সেনা কর্তার এই বাংলাদেশ সফর সম্ভবত ভারতের অজানা ছিল। তাই ভারত এই বিষয়ে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। আসলে মুহাম্মদ ইউনূস চিনকে পাশে নিয়ে এগোতে চাইছেন শুধুমাত্র অর্থ সাহায্যের আশায়। আবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান চাইছেন, চিনকে দূরে ঠেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতে। আর ভারত যেন বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ভারতের একটা বড় অংশ চাইছে এবার সময় এসেছে বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়ার। এই মুহূর্তে ভারতের সেই শক্তি আছে, একাধারে চিনকে হাতে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার। কারণ, একমাত্র ভারতই পেরেছে ট্যারিফ যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঠেকিয়ে রাখতে। এবার ভারত একাই বাংলাদেশকে সবক শেখাতে উদ্যোগী হচ্ছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ইতিমধ্যেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুহাম্মদ ইউনূসের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি ফেসবুকে এক পোস্টে জানান, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধীতা করছি। আমি মনে করি এটা ভারতের চিকেন নেকের জন্য এক ভয়ানক হুমকি। মুহাম্মদ ইউনূসের এই মন্তব্যকে মোটেই হালকাভাবে নেওয়া উচিৎ হবে না বলেই লিখেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, ভারতের সেভেন সিস্টার্স চিনের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশকারী ইউনূসের সামনে বড় বিপদ। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, ভারত চাইলেই চট্টগ্রাম ত্রিপুরার এবং রংপুর শিলিগুড়ির অংশ হয়ে যেতে পারে। আর তাহলে এই সেভেন সিস্টার্স আর ল্যান্ডলক থাকবে না। এই সাতটি রাজ্যও সরাসরি সমুদ্র বন্দরের সুবিধা পেয়ে যাবে। ভারতের জণগনের একটা বড় অংশই এটা চায়। তৈরি আছে ভারতীয় সেনাও। মোদি সরকার কি চাইছে সেটাই এখন দেখার।











Discussion about this post