একাধারে তিনি বিশ্ব শান্তির জন্য নোবেলজয়ী, অন্যদিকে তুখোড় অর্থনীতিবিদ। তিনি মুহাম্মদ ইউনূস, একই অঙ্গে কত রূপ। সম্প্রতি তিনি চিন সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে। আর এই সফরে তিনি চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিংপিন এবং সে দেশের বাণিজ্যমহলকে মস্ত এক মুলো দেখিয়ে এসেছেন। সেই মুলো হল বঙ্গোপসাগর।
চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের এ হেন বক্তব্য নিয়ে এখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে জোরদার চর্চা চলছে। বাংলাদেশের একটি মহলের দাবি, তিনি ভারতের বিরুদ্ধে একটা মস্ত বড় মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে এসেছেন। যা ভারতের পক্ষে কোনও ভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার আরেকটি অংশ মনে করছেন ইউনূসের এ হেন বক্তব্য তাঁর উচ্চাকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু এর কোনও সাড়বত্তা নেই। আসুন একটু জানার চেষ্টা করি, মুহাম্মদ ইউনূস চিনকে যে প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সেটা কতটা সঠিক?
মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশের কাছে বিশাল এক সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে, যেখানে একাধিক বন্দর স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি করা সম্ভব। বিষয়টা তিনি ঠিকই বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক জগতে যে দেশের যত বেশি বন্দর রয়েছে, সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি তত বেশি। কিন্তু চিনের সসম্যা হল আয়তনে বিশাল এই দেশের একটা বড় অংশে কোনও সামুদ্রিক বন্দর নেই। যা আছে সেটা কেবলমাত্র পশ্চিমাঞ্চলে। বাকি তিন দিক স্থল সীমান্ত। ফলে চিনের বৈদশিক বাণিজ্যের একটা বড় অংশ নির্ভর করে অন্য দেশের বন্দরকে কেন্দ্র করে। আমরা জানি, পাকিস্তানের গওদর বন্দর থেকে চিনের শিনচিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড নীতিতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছে। যার নাম চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর। প্রায় ২০০০ কিলোমিটার এই করিডোর ব্যবহার করে চিন পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলিতে তাঁদের পণ্য আমদানি-রফতানি করছিল। এই করিডোরের একটা অংশ আবার পড়ছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে। যা চালু হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু সম্প্রতি পাকিস্তানের বালুচিস্তানে যে গৃহযুদ্ধ সংগঠিত হচ্ছে এবং বালুচ বিদ্রোহীরা যে ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাতে এই চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। সূত্রের খবর, নিজেদের অবকাঠামো রক্ষা করার স্বার্থে চিন প্রাইভেট সেনা মোতায়েন করছে পাকিস্তানে। একইভাবে চিন মিয়ানমারের সামরিক শাসক জুন্টাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সামদ্রিক বন্দর তৈরি করছে। সেখানেও একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছিল চিন। কিন্তু সেখানেও তাঁরা ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্টী আরাকান আর্মি ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। তাই এবার চিনের নজর বাংলাদেশ।
আর এটাকেই কাজে লাগাতে চাইছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি চাইছেন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর চিনের হাতে তুলে দিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ সাহায্য আদায় করতে। কিন্তু চিন কিভাবে সরাসরি চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরে পৌঁছবে? এই অঞ্চলের ম্যাপ দেখলেই বোঝা যাবে, চিনের পণ্য সরাসরি বাংলাদেশে নিয়ে আসতে গেলে ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের মধ্যে দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। তাও তিনি চিনকে প্রস্তাব দিয়ে এলেন। এখানেই উঠছে প্রশ্ন, তাহলে কি মুহাম্মদ ইউনূস চিনের কাছে ভারতের সেভেন সিস্টার্স বেঁচে দিতে চাইছেন? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস এর আগেও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিলেন ভারতকে। এবারও চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর এই ধরণের উচ্চাকাঙ্খি মন্তব্য সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। মিয়ানমারের রাজধানী সিত্তয়ে, সেখানে ভারত একটি গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করেছে। যা কালাদান মাল্টি মোডাল প্রকল্প নামে পরিচিত। ফলে বাংলাদেশ যদি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে নাও দেয়, তাহলেও ভারতের সেভেন সিস্টার্সে পণ্য আদান-প্রদান করতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। কিন্তু সমস্যায় পড়বে চিন ও বাংলাদেশ। যদি ভারত চিনের পণ্য ভারতের সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে দিয়ে যেতে আপত্তি জানায়। তাহলে ইউনূস কেন চিনে দাঁড়িয়ে এত বড় কথা বলে এলেন? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা চিনেরই কৌশল। কারণ, চিন বহুদিন ধরেই চাইছে তাঁদের বিমসটেকের সামিল করা হোক। এই বিমসটেক হল একটি বহুজাতিক মঞ্চ, যার পোশাকি নাম বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন। বিমসটেকের সদস্য দেশগুলি হল, বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থ্যাইল্যান্ড ও ভারত। যার সদর দফতর ঢাকায়। এটাকে মূলত সার্কের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে ভারত। মজার বিষয় হল, আগামী ৪ এপ্রিল থেকে বিমসটেকের সম্মেলন হতে চলেছে থ্যাইল্যান্ডের ব্যঙ্ককে। কিন্তু সেখানে সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাদা করে বৈঠকে বসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু ভারত এখনও কোনও সাড়াশব্দ দেয়নি। অন্যদিকে, সম্প্রতি মিয়ানমার ও থ্যাইল্যান্ডে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হল, তাতে সর্বপ্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি ১১ টন ত্রাণসামগ্রী সহ এনডিআরএফ বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছে মিয়ানমারে। নয়া দিল্লি বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগামীদিনে বঙ্গোপসাগরের সামদ্রিক বাণিজ্যের রাজা ভারতই। সেখানে চিনকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার ও পরিচালনার সম্মতি দিয়ে বোকামির কাজই করে বসলেন মুহাম্মদ ইউনূস। কারণ সেভেন সিস্টার্স ও শিলিগুড়ি করিডোর কেটে দেওয়ার যে প্রচ্ছন্ন হুমকি তিনি বারবার দিয়ে ভারতকে চাপে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটা আদৌ ধোপে টিকবে না। কারণ, ভারত চাইলেই, শিলিগুড়ি করিডোরের দৈর্ঘ ও প্রস্ত বাড়িয়ে নিতে পারে, আবার চট্টগ্রামে বাংলাদেশের চিকেন নেক ফেনী কেটে দিয়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের দখলও নিয়ে নিতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে চিনও পারবে না বাংলাদেশকে বাঁচাতে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more











Discussion about this post