ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ যে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মানুষ চেয়েছিল একটি পরিবর্তন। তাদের সেই দীর্ঘ আকাঙ্খা অবশেষে পূরণ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে পদ্মাপারে তৈরি করেছে এক গভীরতম অসুখ। এই অসুখ অর্থনীতির। ওষুধ বাজারে নেই এমনটা নয়। কিন্তু কিনতে গেলে তো লাগবে অর্থ। সেই অর্থ এখন অনর্থের কারণ হয়ে উঠেছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে গ্যাস সংকটে দেশের ছয়টি প্রধান ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং একটি বেসরকারি কারখানা বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে গত ৫ মার্চ এসব কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরকার এখন বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানি টানা সাত মাস ধরে সংকটে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে পোশাক রফতানি কমার কারণে সামগ্রিক রফতানিও ৩.১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩১.৯০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩২.৯৪ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাক খাতের আয় ফেব্রুয়ারিতে ১৩.২১ শতাংশ কমে ২.৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে এই খাতের রফতানি আয় ৩.৭৩ শতাংশ কমে ২৫.৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সার তৈরির কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ এটা উৎপাদন করতে হলে লাগে প্রচুর কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের প্রধান সারকাখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দিতে সরকার শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে পর পর পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারখানাগুলি হল ঘোড়াশাল – পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড, যমুনা সার কারখানা, আশুগঞ্জ সার কারখানা, কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি। সেটি হল শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী – মধ্যপ্রাচ্যের এই তিনটি দেশে থেকে সার আমদানি করা হয়। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমীরশাহী থেকে ইউরিয়া, সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া এবং ডিএপি আসে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরকার এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশগামী তৈলবাহী জাহাজ চলাচলে তারা কোনও বাধা দেবে না। কিন্তু সেই তেল আসতেও তো সময় লাগবে। বাংলাদেশের শিল্প মালিকেরা তারেক সরকারের কাছে কোটা বরাদ্দ চেয়েছেন, তারা ওই কোটা দিয়ে শিল্পকারখানায় ডিজেল সাপ্লাই দেওয়া যাবে। বর্তমান পরিস্থিতি বদল ঘটতে সময় লাগলে সেটা আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
বাংলাদেশের শিল্পকারখানাগুলি চলে মূলত দুই ধরনের বিদ্যুতে। এক গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুত এবং সরকারি বিদ্যুৎ। সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের জেরে অনেক কারখানাকে ডিজেল চালিতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এদিকে, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের বলেছেন, “ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০০টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে। চাকরি হারিয়েছেন প্রায় দেড় লক্ষ শ্রমিক। প্রতিটি শ্রমিকের ওপর পরিবারের তিনজন করে নির্ভরশীল হলে সে ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সাড়ে চার লাখ। ” যে সব কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার অধিকাংশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল। রয়েছে শতভাগ রফতানির সঙ্গে জড়িত কারখানাও। জুলকারনাইন লিখেছেন, একের পর এক মিল-কারখানা বন্ধ ও লক্ষাধিক লোকের জীবিকা নির্বাহ থেমে গেলেও তাঁদের পক্ষ হতে এ বিষয়ে তেমন কোন কার্যকরী তৎপরতা চোখে পড়েনি। ইদানিং শিক্ষার্থীদের সমস্বরে একটি স্লোগান দিতে লক্ষ্য করা যায় — ক্ষমতা না জনতা? প্রতিউত্তরে শোনা যায় ‘জনতা-জনতা’। শতাধিক কলকারখানা বন্ধ ও লক্ষাধিক শ্রমিকের বেকারত্বে ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্লিপ্ত আচরণ; প্রশ্নের উদ্রেক করে, আসলেই জনতা, নাকি কেবলই ক্ষমতা?












Discussion about this post