বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ২১ আগস্ট পিপলস লিবারেশন আর্মির আমন্ত্রণে চিনের রাজধানী বেজিংয়ে উড়ে গিয়েছিলেন। ২৭ আগস্ট রাতে তিনি ঢাকায় ফেরেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সেনাপ্রধান চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির গ্রাউন্ড ফোর্সের পলিটিক্যাল কমিশনার জেনারেল চেন হুই-সহ ঊর্ধ্বতন চিনা সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সূত্রের খবর, জেনারেল ওয়াকারের এই চিন সফর নিয়ে ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন। কারণ, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অপ্রাকাশযোগ্য সমঝোতা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের আধিকারিকরা সাক্ষরও করেছেন। জানা গিয়েছে, ওই নন-ডিসক্লোজার চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনও চুক্তি বা অস্ত্র কিনতে পারবে না। এই আবহেই বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের বেজিং সফর। যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
জেনারেল ওয়াকারের এই চিন সফর নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট কৌতুহল ছিল। কারণ, এই মুহূর্তে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে শুল্ক যুদ্ধের আবহে যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আবার বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের এই নন-ডিসক্লোজার বাণিজ্য চুক্তিও চিনের নজরে রয়েছে। যেখানে চিনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনও লেনদেন করা যাবে না বলেই উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি। কিন্তু আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জেনারেল ওয়াকারের আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নে সম্ভাব্য চিনা সহায়তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান চিনের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা নরিনকো গ্রুপের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও বর্তমানে ব্যবহৃত বিভিন্ন নরিনকো-সরবরাহকৃত সামরিক সরঞ্জামের আপগ্রেড এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি তাঁর সফরকালে, সেনাপ্রধান বেজিং এবং জিয়াংয়ে অবস্থিত নরিনকো গ্রুপের বিভিন্ন কারখানা এবং গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এছাড়াও জেনারেল ওয়াকার উন্নত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনে নিয়োজিত চায়না অ্যারোস্পেস লং-মার্চ ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড এবং আইশেং ইউএভি ফ্যাক্টরিগুলিও পরিদর্শন করেন।
এখানেই রয়েছে টুইস্ট। বেজিং বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে চিন। এই আবহে যখন সেনাপ্রধান বেজিং সফরে গিয়েছেন, বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যাবতীয় যোগাযোগ রাখছেন ইউনূস। বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দাবি, এই মুহূর্তে টেকনাফ, কক্সবাজারে কয়েকশো মার্কিন সেনা ঘাঁটি গেড়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তের বিস্তৃর্ণ এলাকায় বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে কট্টরপন্থী মৌলবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। যা ভারত ও চিনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকির বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল। এই আবহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিনের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা। তার আগেই অবশ্য ভারত ও চিনের বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল চিন সফর করেছেন। সবমিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মার্কিন আধিপত্য কোনও ভাবেই বরদাস্ত করবে না ভারত, একই উদ্দেশ্য চিনের। অন্যদিকে খলিলুর রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ঠিক হয়ে আছে। সবদিক বিবেচনা করে জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের চিন সফর মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে প্রবল চাপে ফেলল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।












Discussion about this post