গত বছরের ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু খুবই ব্যস্ততার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। ওই তিনদিন তিনিই ছিলেন যাবতীয় ফোকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু ৮ আগস্ট রাত ৮টায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস এবং কয়েকজন উপদেষ্টা শপথবাক্য পাঠ করানোর পর বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। বিগত ১৫ মাসে দুই-একবার তাঁকে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু যে রেটে অপমান তাঁকে করা হয়েছিল, তাতে বোঝাই গিয়েছে তাঁর প্রকৃত অবস্থা ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে। গত বছর ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে লুটপাট চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছিল।
কিন্তু কোনও ভাবে বেঁচে গিয়েছিল রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবন। তার পর থেকে ওই ভবনটি ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর কোনও গুরুত্বই নেই। বঙ্গভবনকে কার্যত অকেজো করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যেন বাংলাদেশে থেকেও নেই। এখন প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতি ভবনের ঠাঁটবাট, গাম্ভীর্য হয়তো রয়েছে, পাইক-পেয়াদা, চাকর-বাকর সবই রয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রপতি কি স্বমহিমায় আছেন? বিগত ১৫ মাসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস কতবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন, সেটা হাতে গুনেই বলা যায়। মাত্র এক-দুবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। কেমন আছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, তিনি কি গৃহবন্দি?
বাংলাদেশেরই বিভিন্ন মহলের দাবি, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কার্যত ঘরবন্দি। জানা যাচ্ছে, তিনি বিশাল বঙ্গভবনের একটি ঘরে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের রক্ষাকর্তা হলেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তাঁকে কার্যত আলঙ্করিক একটি পদে আটকে রাখা হয়েছে নতুন বাংলাদেশে। গণঅভ্যুত্থানের পর সে দেশের ছাত্র-জনতার নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং জামায়তে ইসলামীর নেতারা বাংলাদেশের সংবিধান বদলের দাবি তুলেছিলেন। তাঁরা একটা সময় প্রায় সংবিধান বদলই করে ফেলেছিলেন বলা চলে। কিন্তু তাঁদের সেই প্রচেষ্টা বানচাল হয়েছে কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের জন্য। ছাত্রনেতৃত্ব এবং জামাত শিবিরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউনূসের সরকার রাষ্ট্রপতিকে সরানোর ছকও করেছিল।
কিন্তু সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সেই চেষ্টা থেকে তাঁরা সরে এসেছেন। কিন্তু তা বলে রাষ্ট্রপতিকে প্রতি পদে হেয় করে তাঁকে অপমান করতে এক ফোঁটাও সুযোগ নষ্ট করেননি তাঁরা। যেমন বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস, কূটনৈতিক মিশন, কূটনীতিকদের দফতর, তাদের সরকারি বাসভবন থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রক। একটা দেশের সাংবিধানিক প্রধানকে হেয় করার এতবড় নিদর্শন হয়তো গৃহযুদ্ধে লীন কোনও দেশেও নেই। যা করে দেথিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ কয়েকমাস অপমান সহ্য করে অবশেষে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মুখ খুলেছিলেন। যদিও সেটা করেছিলেন তাঁর পদের শিষ্টাচার অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে স্পষ্ট তাঁর বুকভরা আর্তনাদ।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর এই চিঠিকে সাধারণ চিঠি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা প্রথম ঘটেছিল। যেখানে রাষ্ট্রপতি তাঁর অধস্তন এক সরকারি কর্তাকে চিঠি লিখে তাঁর ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কি এতটুকুও লজ্জিত হয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস? উত্তর হল, একদমই না-তিনি বা তাঁর সরকারের উপদেষ্টারা কোনও ভাবেই লজ্জিত হননি। ওই চিঠিতেই রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, তিনি এই অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরণের সাহায্য করে আসছেন। এখনও পর্যন্ত যতগুলি অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, সবকটাতেই সাক্ষর করেছেন তিনি। তাহলে কেন তাঁকে এই অপমান? আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি কেবলমাত্র আলঙ্করিক পদ নয়, তিনি কোনও অধ্যাদেশ বা বিলে সাক্ষর না করলে সেটা আইনে পরিণত হয় না। সেই রাষ্ট্রপতিকেই কার্যত অচ্ছুত করে রেখেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এখন বঙ্গভবনে তাঁর সময় কাটে পরিবারের লোকজন এবং তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে গল্পগুজব করে আর বই পড়ে। বঙ্গভবনের আর পাঁচটা ভাস্কর্যের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর কোনও প্রভেদ নেই।












Discussion about this post