তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরতেই অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তারেকের দেশে ফেরা এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দলটিকে দ্বিগুণ অক্সিজেন জুগিয়ে দিয়েছে। ফলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জিতে পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির সুযোগই যে বেশি সেটাই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশ। এমনকি তারেককে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতও। আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিতেই যে নয়া দিল্লি বাজি ধরেছে সেটাও ক্ষণে ক্ষণে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যেই অনেকে ধরে নিচ্ছেন, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী খালেদাপুত্র তারেক রহমান জিয়া। এখানে অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে জামাত-এনসিপি জোট। এই পরিস্থিতিতে তারেকের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎ বা বৈঠকের জন্য ইতিমধ্যেই লাইন লেগে গিয়েছে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে। একদিকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান প্রথা ভেঙে বিএনপি অফিসে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করলেন। সবমিলিয়ে বিএনপির মধ্যে একটা ফিল গুড পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা তখনই হয় যখন কোনও রাজনৈতিক দলের দিকে জনমত বেশি থাকে অথবা নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিয়তা তৈরি হয়।
প্রায় ১৭ বছর তারেক রহমান বাংলাদেশের বাইরে ছিলেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের শাসনকাল প্রায় ১৫ বছর তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর পাল্টে যায় ঘটনাপ্রবাহ। আওয়ামী লীগের সরকার এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। গণঅভ্যুত্থানে জামাত-সহ অন্যান্য কয়েকটি সংগঠনের পাশাপাশি বিএনপির ভূমিকাও ছিল সেটা খালেদা জিয়ার দল অনেকবার দাবি করেছে। ফলে ইউনূস ক্ষমতায় এসেই বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর পুত্র তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা যাবতীয় অভিযোগ ও মামলা তুলে নিয়ে তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। ফলে তারেক রহমানের দেশে ফিরতে আর কোনও অসুবিধা ছিল না। কিন্তু তারেকের কাছে নিশ্চই কিছু বাঁধা ছিল। তাই মায়ের গুরুতর অসুস্থতা সত্বেও তিনি দেশে ফিরতে চাননি। মনে করা হয়, সেই বাঁধাগুলির অন্যতম ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ১৭ বছর আগে তারেক দেশত্যাগ করার আগে সেনাবাহিনীর কাছেই নাকি মুচলেকা জমা দিয়ে বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন, এমন কথা কানপাতলেই শোনা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। ফলে তাঁর দেশে ফেরার অন্যতম কারণও সেনাবাহিনীর ছাড়পত্র, সেটা বলাই বাহুল্য।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনও কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করলেন। তিনি হলেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআই-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদ। তিনি রবিবার বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে দলটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। এই অভূতপূর্ব বৈঠক ঘিরে বাংলাদেশের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক মহলে ব্যাপক আলোচনার যেমন জন্ম দিয়েছে। তেমনই বাংলাদেশের জনমনে নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এই ধরণের বৈঠক যে হয় না তা ঠিক নয়। তবে সেটা অত্যন্ত গোপনে অজ্ঞাত কোনও স্থানে হয়ে থাকে। কিন্তু এনএসআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদ এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক সরাসরি দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়াকে ‘অপ্রত্যাশিত ও প্রথা-বহির্ভূত’ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিন পর, ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট মেজর জেনারেল ফরিদকে এনএসআই-এর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি ইউনূস বা তাঁর অনুগামীদের ঘনিষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। প্রসঙ্গত, তারেক রহমান সদ্য বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এখনও সংসদ সদস্য বা রাষ্ট্রীয় কোনও নির্বাহী পদে আসীন হননি। তার আগেই তাঁর সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি অংশ যেভাবে প্রথা ভেঙে সাক্ষাৎ করছেন তা নিয়েই জল্পনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বাংলাদেশে ফেরার পর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং চাকরিরত সেনা কর্মকর্তা সামরিক বিধি উপেক্ষা করেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, সেনাবাহিনী নিয়ে যে ভয় তারেক রহমানের উপর চেপে বসেছিল, সেটা দূর করতেই ওই অংশ সক্রিয়। তাহলে কি ভারতের গ্রীন সিগন্যালের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এবার তারেকের পাশেই দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে? পরিস্থিতি অন্তত সেদিকেই এগোচ্ছে।












Discussion about this post