বাংলাদেশের সংবিধানকে কারা কবর দেওয়ার ডাক দিয়েছিল তা আমরা সকলেই জানি। তাঁরাই এখন চাইছে, যত দ্রুত সম্ভব জুলাই ঘোষণাপত্র বা জুলাই সনদ লাগু করতে। কেন এই তৎপরতা, তা নিশ্চই বলে দিতে হবে না? বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আবার বহু ক্ষেত্রে পালাবদল হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে এর নজির অসংখ্য। আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই বাংলাদেশ। যেখানে গত বছরের ৫ আগস্ট এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধিন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। যে সরকার মাত্র কয়েকমাস আগেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। সেই সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ তথা শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু তাঁরই সরকারের একটা বড় অংশ চাইছে, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে নতুন সংবিধান নিয়ে আসতে। যার সুচনা নীহিত আছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। কেন এই উদ্যোগ, আসুন সেটা নিয়েই কিছু আলোচনা করা যাক।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ইতিহাসে সেই যুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামেই স্মরণীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আহ্বানে এবং তাঁরই নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অসংখ্য মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ভারত সামরিক শক্তি কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং পাকিস্তানকে যুদ্ধে হারিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। বাংলাদেশে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। সেই সরকারই ১৯৭২ সালে রচনা করে বাংলাদেশের সংবিধান। যা মূলত চারটি ভিত্তির উপর নির্ভর করে লেখা হয়েছিল। চারটি মূল নীতি ছিল জাতিয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। যা বাংলাদেশকে উদার এক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশের বর্তমান শাসককূল চাইছেন না বাংলাদেশ উদার ধর্মনিরপেক্ষা রাষ্ট্র থাকুক। তাঁদের লক্ষ্য ইসলামী অনুশাসনে এক কট্টরপন্থী তালিবানী শাসন আসুক বাংলাদেশে। যে পাকিস্তান থেকে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের, বর্তমান শাসককূলের লক্ষ্য ফের সেই পাকিস্তানেই মিশে যেতে। এর মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মূল শক্তি, অর্থাৎ জামায়তে ইসলামী বাংবাদেশ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি পদে যারা বাঁধা দিত, যাদের জন্য লক্ষ লক্ষ নারী তাঁদের সম্মান ও উজ্জত খুঁয়িয়েছিলেন সেই রাজাকার বাহিনীই আজ বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন। আসলে ক্ষমতা তো তাঁরা দখল করে নিয়েছেন, কিন্তু সেটা যে অবৈধ উপায়ে বা বাংলাদেশের সংবিধানবিরোধী উপায়ে সেটা এখন পরিস্কার হয়ে উঠছে। তাই সংবিধানকেই বদলে দিতে চায় তাঁরা। নাহলে পরবর্তী সময়ে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলেই মনে করছেন তাঁরা।
বাংলাদেশেও বেশ কয়েকবার সামরিক শাসন এসেছিল। কিন্তু সেই সময়ও কেউ বাংলাদেশের সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান রচনার কথা চিন্তা করেননি। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করে নিয়েছিলেন সেই একনায়করা। কিন্তু এখন জুলাই আন্দোলনের হোতা বা ছাত্র নেতারা চাইছেন সংবিধানটাই কবর দিতে। এর কারণ বর্তমান সংবিধানের ৭ এর ২ অনুচ্ছেদে পরিস্কার বিধান রয়েছে, এই সংবিধানই প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং সংবিধান বহির্ভূত যে-কোনও কর্মকাণ্ড বেআইনি। পাশাপাশি ৭ এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষ যদি এই সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার চেষ্টা করে, তবে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল এবং দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, যে বা যারা ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল করে জুলাই সনদ বা জুলাই ঘোষণাপত্র চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এটাই আসল কারণ, বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তন করে নতুন সংবিধান রচনা করার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুরোপুরি অবৈধ। সংবিধানের কোনও নিয়ম না মেনেই শপথ নিয়েছে। তাই নতুন সংবিধান রচনা করে তাঁরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে চাইছেন।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post