বাংলাদেশে বিগত তেরো মাস ধরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তরবর্তী সরকার চলছে, তাঁর সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়। ভারত সরকার বিগত এক বছরে হাবে ভাবে এবং কূটনৈতিকভাবে ইউনূসের সরকারকে বুঝিয়ে আসছে দিল্লি বাংলাদেশে একটা স্থায়ী সরকার চায়। তাই দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করুক তাঁরা।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের যে খুব বেশি আলাপ আলোচনা হয়েছে, এমনটা নয়। বরং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই শীতলতার দিকে এগিয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় নেওয়ায় মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। তাঁরা বারংবার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পনের আর্জি জানিয়েছে ভারতের কাছে, কিন্তু ভারত সরকার খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি এই ব্যাপারে। উল্টে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন ও হামলার বিষয়টি ভারত একাধিকবার তুলেছে। এমনকি বাণিজ্য নিয়েও কড়াকড়ি করেছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন করাবেন বলে ঘোষণা করেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ রাখার ব্যাপারে অনড় ইউনূস ও তাঁর দোসররা। যা ভারতের রাগের অন্যতম কারণ। কারণ গত ২০ আগস্টও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ”ভারত আবার জানাতে চায়, আমাদের প্রত্যাশা হল বাংলাদেশে দ্রুত অবাধ,শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হোক। যেখানে মানুষ তাদের রায় দিতে পারবে এবং মানুষ কী ভাবছে, তা বোঝা যাবে।
কূটনৈতিক ভাষায় বার্তা স্পষ্ট, এই ‘ইনক্লুসিভ’ মানে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা সহজ বাংলায় সবাইকে নিয়ে নির্বাচন চায় ভারত। সবাই বলতে আওয়ামী লীগও অংশগ্রহণ করবে আসন্ন নির্বাচনে। যদিও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যকলাপের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার হাসিনার দল আগামী নির্বাচনে লড়তে পারবে না। ঠিক এই জায়গায় ভারতের কাজটা যথেষ্টই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যদি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তোলে ইউনূসের সরকার, তাঁদের ভোটে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে ভারত কি অবস্থান নেবে? এটাই এখন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের কৌতূহলের বিষয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি শেষ মুহূর্তেও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের ফলাফল বদলে যাবে। তাঁরা ভালো ফল করে সরকার গঠনের জায়গায় চলে যেতে পারে। আর যদি সরকার গঠন নাও করতে পারে তাহলেও আওয়ামী লীগ বিরোধী আসনে বসার যোগ্যতা পেয়ে যাবে। ঠিক জায়গায় ভয় পাচ্ছে বিএনপি, জামাত ও এনসিপি-র মতো রাজনৈতিক দলগুলি। অপরদিকে ভারত সব ধরণের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে ইউনূস সরকারের ওপর যাতে আসন্ন নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, আওয়ামী লীগও যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। যদি সেটা না হয়, তাহলে প্ল্যান বি বা সি ভেবে রাখতে হবে ভারতকে।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান, গুরুত্ব, পছন্দ বোঝার ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখা খুবই জরুরি। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ লড়তে পারবে না, এটা ধরে নিয়েই ভারতের প্রথম চাওয়া হবে একটা স্থায়ী সরকার যেন ক্ষমতায় আসে। ভারত বারবার একটা বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাঁরা জরুরি বিষয় ছাড়া অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী নয়। বিগত এক বছরে মাত্র একবার ব্যঙ্ককে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তাও মাত্র মিনিট দশেকের জন্য। এর বাইরে ভারত বিদেশমন্ত্রী এবং বিদেশ সচিব পর্যায়ের দুটি বৈঠকে রাজি হয়েছে। ভারত হাবে ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, যে অন্তর্বর্তী সরকার অল্প কিছুদিনের জন্য ক্ষমতায় আছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কথা বলতে আগ্রহী নয়া দিল্লি। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারত বিএনপি-কেই ক্ষমতায় দেখতে চাইবে। কারণ, জামায়েত ও এনসিপি-কে নিয়ে ভারত খুব বেশি আশাবাদী নয়। কারণ এই দুটি দলই খোলাখুলিভাবে পাকিস্তানপন্থী, ফলে জামাত ক্ষমতায় এলে ভারতের বিপদ। অপরদিকে বিএনপি হল আওয়ামী লীগের মতোই পুরোনো রাজনৈতিক দল, কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে তাঁরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোট তো কোথাও একটা যাবে। আজকের বাংলাদেশে জামাত ও কট্টরপন্থী দলগুলির কাছে কার্যত কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। তাই অনেকে মনে করছেন, আওয়ামীর ভোট বিএনপির বাক্সেও যেতে পারে। যদিও দুই দলের মধ্যে শত্রুতাও রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এখানে ভারতের চাওয়া-পাওয়ার খুব বেশি গুরুত্ব নেই। বাংলাদেশের মানুষ যাদের ক্ষমতায় আনবে, ভারতকে তাদের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। কিন্তু কয়েকজন বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতীয় গুপ্তচর ও গোয়েন্দারা বাংলাদেশে অতি সক্রিয়, ফলে যে কোনও সময় পরিস্থিতি ঘুরে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে পুনর্বাসন করাটাই ভারতের একমাত্র লক্ষ্য।












Discussion about this post