কুমিল্লা-৬ আসনের আওয়ামী লীগের একজন কুখ্যাত সাংসদ বাহাউদ্দিন বাহার থেকে আজকের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী, যেন একই নৌকায় সাওয়ার। বাংলাদেশে হিন্দুধর্ম বিদ্বেষী মনোভাবের দুই প্রতীক। বলা হয়, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে চলে। কিন্তু সেই ২০২১ সালে সেই দলেরই সাংসদ বাহাউদ্দিন বাহারের এক কুরুচিকর কাণ্ডের জেরে বাংলাদেশে সেবার শারদীয়া দুর্গোৎসব পালনই করতে পারেননি সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়। এরপর ২০২৩ সালেও কুমিল্লা-৬ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ বাহাউদ্দিন বাহার মন্তব্য করেছিলেন, দুর্গাপূজাকে ‘মদের উৎসব’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি ঠিক কি বলেছিলেন, শুনে নিন…
কি মনে হচ্ছে, ভাবছেন এই ধরণের কথা আর কার মুখে যেন শুনেছি? হ্যাঁ শুনেছেন, তিনি হলেন বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী। তিনিও ভরা সাংবাদিক সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন, দুর্গাপুজো হল মদ-গাঁজা খাওয়ার আসর। তাই তিনি পুজো মণ্ডপে মেলা বসতে দিতে চাইছেন না।
শুনলেন তো, বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো নিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ নেতাদের মনোভাব ঠিক কি। প্রতিবাদ আগেও হয়েছে, প্রতিবাদ আজও হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। শেখ হাসিনা, যিনি সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তাদানকারী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন, তিনিও তাঁর দলের সাংসদের মুখে লাগাম টানতে পারেননি। মুহাম্মদ ইউনূসও পারছেন না। যদিও শারদীয় দুর্গাপূজার সঙ্গে ‘গাঁজা ও মদ’ খাওয়াকে জড়িয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরীর মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। অনতিবিলম্বে তাঁর এ বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে তাঁরা। কিন্তু চার-পাঁচদিন পরও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর উপদেষ্টাকে ধমক পর্যন্ত দেননি। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর করা মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলালও। কিন্তু কোনও হেলদোল নেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার। তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এহেন মন্তব্য যে ভারত ভালোভাবে নেয়নি, সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে ভারতের বিদেশমন্ত্রক।
ভারতের বুঝেই অন্য পন্থা অবলম্বন করেছে ঢাকা। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আগে কলকাতায় ইলিশের চাহিদা মেটাতে উদ্যোগী হল অন্তর্বর্তী সরকার। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১২০০ টন ইলিশ শর্তসাপেক্ষে ভারতে রফতানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল ইলিশের ভারতে রফতানি করা ইলিশের দাম বাংলাদেশের থেকেও কম রাখা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য এই মুহূর্তে ২০০০ টাকার বেশি, সেখানে ভারতে রফতানি করা ইলিশের ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১২ ডলার। যা ভারতীয় টাকায় প্রতি কেজিতে পড়বে দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি। উল্লেথ্য, গত বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথমে ভারতে তিন হাজার টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ইলিশ এসেছিল ২৪২০ টন। এবার তার অর্ধেক ইলিশ আসছে ভারতে। তবুও অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে ভারতে ইলিশ পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার, সেটাতেই অনেকে অবাক হচ্ছেন। মনে করা হচ্ছে, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কুরুচিকর মন্তব্য ঢাকতেই ঢাকা ইলিশের রফতানিতে শিলমোহর দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দুদের পুজোপার্বন নিয়ে অসহিষ্ণুতার যে চিত্র কয়েক দশক ধরে চলে আসছে, তার কোনও অন্যথা হয়নি, বরং ইউনূসের আমলে তা বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ আগামী ১৩ অক্টোবর শুক্রবার যৌথভাবে সারা দেশে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের ডাক দিয়েছে। এখন দেখার এতে ইউনূসের টনক নড়ে কি না।












Discussion about this post