যাবতীয় আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার, সকালে সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হল বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চলবে বিকেল সাড়ে ৪টে পর্যন্ত। একই সঙ্গে জুলাই সনদের ওপর নেওয়া হবে গণভোট। আগের দিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এ এমএম নাসির উদ্দিন। নির্বাচনকে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। ভোট হচ্ছে ২৯৯ টি আসনে। কয়েকদিন আগে শেরপুর ৩ আসনের এক প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় ওই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। ভোটে অংশ নিয়েছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ১৭৫৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হাসিনা সরকারের পতনের দেড় বছর বাদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন। এই ভোটে নেই আওয়ামী লীগ। যে কারণের ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও দুদিন অর্থাৎ সরকারিভাবে ছুটি থাকায় টানা চারদিনের একটা লম্বা ছুটি। অনেকেই ভোট দিয়ে বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে চেপে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছেন। বাংলাদেশের সর্বশেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। এর মাত্র দুই বছরের মাথায় আরও একটি সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ২৪-য়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। গণ অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের তিনদিনের মাথায় ২৪-য়ের আট অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এর কয়েক মাসের মাথায় জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানায় বিএনপি সহ কয়েকটি রাজনৈতিকদল। এই নিয়ে তাদের সঙ্গে তদারকি সরকারের শুরু হয় টানাপোড়েন। গত বছর জুনে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন তদারকি সরকার প্রধান। এরপরেই নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা কাটে। গত বছর জুলাইতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুস ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা হয়। যদিও ঘোষণার পরেও নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। বাতাসে ভাসতে থাকে বিশেষ একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা চালাবে। সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পদ্মাপারে শুরু হল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
বাংলাদেশের ভোট কেমন হচ্ছে তা দেখার জন্য ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৩৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক সেখানে রয়েছেন। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসঙ্ঘ তাদের কোনও প্রতিনিধি পাঠায়নি। তারা যে কোনও প্রতিনিধি পাঠাবে না, তার একটা ইঙ্গিত আগেও পাওয়া গিয়েছিল। আমেরিকা ও ভারতের দাবি ছিল, এই নির্বাচন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমুলক। যার অর্থ আওয়ামী লীগকে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু সেই দাবি মানতে অস্বীকার করে ঢাকা। ইউনুসের প্রেস উইং জানিয়েছেন, ৩৯৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি। যে সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে, সেই সব দেশ থেকে মোট ২৪০ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ৫১ জন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসেছেন। সব মিলিয়ে ২১টি দেশ থেকে এসেছেন পর্যবেক্ষকরা। পাকিস্তান থেকে এসেছেন আটজন, ভুটান থেকে দুইজন, শ্রীলঙ্কা থেকে ১১ জন, নেপাল থেকে একজন, ইন্দোনেশিয়া থেকে তিনজন, ফিলিপিন্স থেকে দুজন, মালয়েশিয়া থেকে ছয়জন, জর্ডন থেকে দুই, তুরস্ক ১৩, ইরান তিন, জর্জিয়া ও রাশিয়া দুইজন করে মোট চারজন, জাপান থেকে পাঠানো হয়েছে চারজনকে। কিরঘিস্তান থেকে পাঠানো হয়েছে দুইজনকে। এই তালিকায় ভারত ও আমেরিকার কোনও প্রতিনিধি না থাকায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যে সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে “এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন”, “কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট”, “ ইন্টারন্যাশাল রিপাব্লিকান ইন্সটিটউট ”, “ ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইন্সটিটিউট। ভারতের না আসার পিছনে বিশ্লেষকেরা তিনটি প্রধান কারণ দেখছেন। প্রথমত, নিরাপত্তা ও ভারত বিরোধী হাওয়া, দ্বিতীয়ত ইউনুসের সঙ্গে টানাপোড়েন। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল দিল্লি মনে করে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন কখনই গণতান্ত্রিক হতে পারে না।












Discussion about this post