বাংলাদেশে গত দেড় বছরে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে গুম-খুনের অভিযোগ খুব একটা শোনা যায়নি। তবে জেল ও পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়া বিগত দেড় বছরে অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের যে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং পশ্চিমা কয়েকটি দেশের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা হল মব সন্ত্রাস বা মব জাস্টিস। এই মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের মতো ঘটনা অব্যাহত থাকলেও এর বিরুদ্ধে কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়নি মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। যেখানে, বিগত হাসিনা সরকারের আমলে গুম-খুন অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে এই সরকার খুব তৎপরতা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের র্যা ব-সহ বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাঁসির সাজার রায় পর্যন্ত এসে গিয়েছে একটি মামলায়। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘণের সবচেয়ে গুরুতর দুটি বিষয়ে এই সরকার কার্যত মুখে কুলুপ ও চোখে ঠুলি পড়ে বসে রয়েছে। একটা হল ক্রমাগত সংখ্যালঘুদের উপর বেড়ে চলা অপরাধ, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ আর দ্বিতীয়টা হল, মব সন্ত্রাসের নামে যাকে ইচ্ছা তাঁকে গণধোলাই, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে এবার আদালতও রেহাই পাচ্ছে না এই মব সন্ত্রাসীদের হাত থেকে।
ঘটনা হল, বাংলাদেশের এক বাউলিয়া আবুল সরকারের একটি ভিডিও সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে প্রচার করা হয়েছিল তিনি নাকি মুসলিম ধর্মের অবমাননা করেছেন। মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে প্রকাণ্ড আঘাত করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তৎক্ষণাৎ তাঁকে গ্রেফতার করে। যদিও তাঁর শিষ্য ও বাউলের গুণমুগ্ধ ভক্তদের দাবি ছিল, এটা সাজানো ভিডিও এবং তিনি এ কাজ করেননি। তবুও পুলিশ তাঁকে আদালতে হাজির করিয়ে জেলে পাঠায়। গত সোমবার অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর বাউল শিল্পী আবুল সরকারের জামিনের আবেদনের শুনানি ছিল মানিকগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আদালত প্রাঙ্গণে জামিন শুনানির সময় শতাধিক আইনজীবী আবুল সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সাজার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। উপরের ভিডিওটি সেটারই প্রমান। বিক্ষোভ চলাকালীন আইনজীবীদের স্লোগান যথেষ্টই কানে বাঁধে। স্লোগানে আইনজীবীরা বলছেন, “একটা একটা বাউল ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”! আদালত চত্বরেই আইনজীবীদের একটা অংশ যদি এই ধরণের ভাষায় স্লোগানিং করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে আইনের শাসন ঠিক কোথায়? ঘটনাচক্রে সোমবারই বাউল শিল্পীর জামিন নামাঞ্জুর হয়েছে যথারীতি। প্রশ্নটা সেখানে নয়, প্রশ্নটা হল বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূস সরকার কি অন্ধ হয়ে গিয়েছে? সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যমেও আইনজীবীদের এই বিতর্কিত স্লোগান নিয়ে খবর হয়েছে। তা নিশ্চই অন্তর্বর্তী সরকারের চোখে পড়েনি, কান পর্যন্ত পৌঁছয়নি?
বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সম্পাদক সাইদুর রহমান বলছেন, “এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ‘অজ্ঞাতনামা লাশ’। পাশাপাশি মব সন্ত্রাস দেশজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে নাজুক করে তুলেছে”। বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র দাবি করেছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ১১১ জন। প্রথম আলোর দাবি, বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন ১৮৫ জন। গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছে, যা দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে যারা সবচেয়ে বেশি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সেই আইনজীবী সমাজই এখন আদালতের ভিতরই “ধরে ধরে জবাই” করার নিদান দিয়ে স্লোগান তুলছে। সেই দেশের আইনের শাসন কি হতে পারে ওই একটি ভিডিও আরামসে প্রমান করতে পারে। বাউল শিল্পী আবুল সরকার হোক বা ইসকনের সন্নাসী চিন্ময়কৃষ্ণ প্রভু, কেউই খুব গুরুতর কোনও অপরাধ করেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তেও হয়তো বড় কোনও প্রমান নেই। তবুও তাঁরা জেলে পচছেন। কারণ সরকারই এই মব সন্ত্রাসীদের উৎসাহ দিচ্ছে, তাঁদের ভীতি সঞ্চার করতে উৎসাহিত করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে থোরাই কেয়ার ইউনূস সাহেবের।












Discussion about this post