আলাদা আলাদা ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত রবিবার থেকে বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা ও সংঘর্ষ চলছে। এর মধ্যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ কেন বা কি কারণে এমন অশান্ত হয়ে উঠলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে এক নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটলেই সেখানে আইনের মধ্যে থেকে বল প্রয়োগ করা হবে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির সভার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে ওই নির্দেশিকায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত এক বছরে বাংলাদেশে ছাত্রদেরই দাপট দেখা যাচ্ছে। গত বছর জুন-জুলাই মাসে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে যার শুরু হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পরও তা অব্যাহত। রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে দফায় দফায় ছাত্র সংঘর্ষ হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়েছে সেই সমস্ত সহিংস সংঘর্ষ থামাতে। অপরদিকে ঢাকার জনগণও অতিষ্ট হয়ে উঠেছে ছাত্রদের বেলাগাম আন্দোলনের জন্য।
গত সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চূরান্ত অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের নমনীয়তার সুযোগ নিয়েই দিন দিন ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক অস্থিরতা, ছাত্র সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন স্থানে মব ভায়োলেন্স প্রবলভাবে বেড়েছে। দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের হাত ধরেই মুহাম্মদ ইউনূসের এই সরকার টিকে আছে। তাই সরকার ছাত্রদের কোনও দোষ দেখেও দেখতে পাচ্ছে না। এর ফলস্বরুপ বাংলাদেশের প্রায় সবকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। পডুয়ারাই কার্যত দাদাগিরি চালাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, তাঁদের কথায় চলতে হচ্ছে অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকদের। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে। তাই এবার কঠোর হওয়ার চেষ্টা করছে ইউনূসের সরকার। এছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চাইছে সরকার। অনেকেই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যা নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারের একটি সূত্র বলছে, এর সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ বাড়াচ্ছে ভারত। তাই এবার কঠোর হওয়ার সময় এসেছে, না হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।
গত বছর কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের এক দফা আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থানের পরও অনেক ক্যাম্পাস কেন পুরোপুরি স্বাভাবিক হল না সেই প্রশ্নের মুখে কার্যত অসহায় ইউনূস। অন্যদিকে এই আন্দোলনগুলির জেরে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস বন্ধ রাখতে হচ্ছে, এতে পঠন-পাঠন বন্ধ হয়ে পড়ছে। যার ফল ভুগতে হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে প্রযুক্তি এবং মেডিকেল পড়ুয়াদের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গীন। একটি অংশ মনে করছেন, ছাত্রদের এই লাগাতার আন্দোলনের ফলে নতুন করে অভ্যুত্থান বা গণ আন্দোলনের সূচনা হতে পারে বাংলাদেশে। আর সেই কারণেই চিন্তিত ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও সরকারের একটা অংশ দাবি করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য বল প্রয়োগ করা শুরু হতেই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। আর সেটা হলে ইউনূস সরকারের পতনও নিশ্চিত হবে। কারণ সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। আর ক্যাম্পাসগুলিতে নতুন করে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পিছনে আওয়ামী লীগ ও ভারতের হাতও দেখছেন উপদেষ্টাদের একাংশ। সেই কারণেই হয়তো এই ধরণের ছাত্র সংঘর্ষ কঠোর হাতে দমনের নির্দেশিকা জারি করা হল।












Discussion about this post