শ্রেণির প্রাণী আছে, যারা গুলিয়ে জল খায় বলেই দাবি। অর্থাৎ, সোজা পথে যে কাজ করা যায়, নির্বুদ্ধিতায় সেই কাজই কঠিন করে তোলে তাঁরা। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে বিগত পাঁচ দশকে বৃহত্তর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল সুমধুর। এমনকি আরেক বড় প্রতিবেশী চিনের সঙ্গেও তাঁদের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক ছিল মজবুত। কিন্তু বিগত এক বছরে বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এই দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপের দিকে নিয়ে গিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন সবচেয়ে তলানিতে, চিনের সঙ্গে এতটা না হলেও এই মুহূর্তে সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। এর একমাত্র কারণ, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। যদিও এই সরকারটাই যুক্তরাষ্ট্রের মদতে এবং অর্থায়নে ক্ষমতায় এসেছে, বলা ভালো বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসিয়ে ওয়াশিংটনই। এর একমাত্র কারণ, বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে একটি ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের দিকেই নজর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কৌশলগত দিক থেকে এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে এলে, ভারতের যেমন গুরুত্ব কমবে, তেমনই প্রবল চাপে পড়বে চিন ও রাশিয়া। কারণ, এই দুই দেশের সামদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই এই অঞ্চল দিয়ে হয়। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঢুকে পড়লে, বাঁধার সম্মুখীন হতে হবে চিন ও রাশিয়াকে। আর এই বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এর ফল ভুগতে হবে মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন কার্যত ঘেঁটে ঘ হয়ে রয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস যে হেতু নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান নন, তাই তাঁকে কয়েকটি রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। আবার মুহাম্মদ ইউনূস মার্কিন ডিপ স্টেটের মস্তিষ্কপ্রসুত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন, তাই তাঁকে মার্কিন আবদার মেটানোর দায়িত্ব নিতেই হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ যেমন ঘোষিতভাবে ভারতপন্থী দল হিসেবে পরিচিত ছিল, তেমনই বিএনপি চিনপন্থী। আবার জামায়তে ইসলামী পাকিস্তানপন্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দলও পাকিস্তানপন্থী। ফলে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ঐক্যমত তৈরি করে মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের কার্যসিদ্ধি সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বেজিংও এই ব্যাপারে হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইউনূসের মতলব তাঁরা আগেভাগেই বুঝেছে। সেই কারণে বাংলাদেশের প্রথমসারির তিন রাজনৈতিক দের প্রতিনিধিদের ঘনঘন আমন্ত্রণ করে মগজধোলাই করেছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। যেমন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিন দফায় চীন সফরে গিয়েছেন বিএনপি নেতারা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান খান রিপনের নেতৃত্বে চিন সফরে গিয়েছিল এক প্রতিনিধি দল। তারপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপি ও মিত্র রাজনৈতিক দলের একটি প্রতিনিধি দল চিন সফর করেছিল। সবশেষে চলতি বছরের জুন মাসে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফকরুল আলমগীরের নেতৃত্বে একটি দল বেজিং ঘুরে আসেন। বিএনপির দলটি ফেরার পরই জুলাই মাসে চিনে যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল। জামায়তে ইসলামীর পর পরই জাতীয় নাগরিক পার্টির ৮ শীর্ষ নেতা চারদিনের চিন সফরে গিয়েছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে। এই দলে সারজিস, পাটওয়ারি, সামান্তা শারমিন-সহ একাধিক শীর্ষ নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কৌতুহল, এত ঘনঘন চিন সফর কেন। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূসও এক দফা চিন সফর করেছিলেন।
আগস্ট মাস পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। একদিকে যখন মুহাম্মদ ইউনূস, খলিলুর রহমান-সহ একাধিক উপদেষ্টা মার্কিন বর্নচাইল্ড হিসেবে ওয়াশিংটনের স্বার্থ দেখতে ব্যস্ত। অন্যদিকে চিনও নিজেদের মতো করে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মার্কিন শুল্ক-ধাক্কা এবং আগস্টের শেষে চিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের পর বদলে গেল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি। ভারতের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতেই চিন নয়া দিল্লির সমর্থনে পাশে চলে এল। রাশিয়াও ভারতের পাশে ছিল। ফলে মার্কিন শুল্কযুদ্ধের আহবে চিন-রাশিয়া-ভারত একজোট হয়েছে। প্রবল চাপে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও আশঙ্কায় রয়েছে। কারণ, বেজিং এবার বাণিজ্যিক কারণে বৃহৎ শক্তি হিসেবে নয়া দিল্লির পাশেই দাঁড়াবে। ফলে অহেতুক ভারত বিরোধিতা করা বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের সামনে এটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা দেওয়া ইউনূসের সামনেও কঠিন চ্যালেঞ্জ, ভারত ও চিনকে ঠেকানো। সবমিলিয়ে বাংলাদেশকে এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনস্থাপন করতে সরু লাইন খুঁজতে হবে। না হলে সমুহ বিপদ।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post