বাংলাদেশের রাজনীতিতে সমীকরণ ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে। বিগত কয়েকমাস ধরে যেমন জানা যাচ্ছিল, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। ইউনূসের প্রিয়পাত্র হাসনাত, আসিফ মাহমুদরা তো এটাও ফাঁস করেছিলেন যে জেনারেল ওয়াকার মোটেও মুহাম্মদ ইউনূসকে এই পদে মেনে নিতে চাননি। বুকে পাথর চাপা দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন ইউনূসকে। এরপরও দেখা গিয়েছিল, দুজনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা দ্বন্দ্ব। তবে এটাও ঠিক, জেনারেল ওয়াকার মুখে বেশ কয়েকবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সাবধান করলেও তিনি সেভাবে কোনও পদক্ষেপ নেননি বিগত এক বছরে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলেও সেনাপ্রধান কানে তালা দিয়ে বসেছিলেন। গত এপ্রিলে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ওপর সেনাবাহিনীর গুলি চালানোর ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যুর পর সেনাপ্রধান যখন কোনও ব্যবস্থা নিলেন না, তখন থেকেই একটা আঁতাতের গন্ধ পেতে শুরু করলেন বাংলাদেশের এক শ্রেণির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, সেনাপ্রধান গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর দাবি করেছিলেন বাংলাদেশের ভালোমন্দের দায়িত্ব তাঁরই কাঁধে থাকবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা আজও হয়নি। এখানেই তাঁরা মনে করছেন, ইউনূস ও ওয়াকেরর মধ্যে একটা আঁতাত থাকলেও থাকতে পারে।
এই আশঙ্কাই এবার স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতি উত্তাল হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূরের উপর আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মারধরের ঘটনার পর। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বা জাপাকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর দলবল নিয়ে তাঁদের সদর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বিক্ষোভ দেখাতে। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, ওই কার্যালয়ের দখল নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। অর্থাৎ মব সৃষ্টি করে আরেকটি আপত্তিকর কাণ্ড ঘটাতে যাচ্ছিলেন নূর। কিন্তু সকলকে আশ্চর্য করে বাধ সাঁধে সেনাবাহিনী। তাঁদের পাল্টা মারে গুরুতর জখম হন নুরুল হক নূর। সেনাবাহিনীও তাঁদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর উপর আক্রমণ হতেই তাঁরা লাঠি চালায়। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল যে কোনও রকম মব বাহিনী বরদাস্ত করবে না। কিন্তু নূরের ওপর হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া বিবৃতি ছিল সেনাবাহিনীর দেওয়া বিবৃতির থেকে উল্টো। সরকার বলে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নুরের ওপর ‘হামলার’ ঘটনায় জড়িত কেউই ছাড় পাবে না এবং দ্রুত বিচার শেষ করা হবে। প্রশ্ন উঠছিল, যেহেতু হামলাকারীরা সেনাবাহিনীর সদস্য, সেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার কি তাঁদেরই দায়ি করছে? যেখানে সেনাবাহিনী স্পষ্ট করেছে তাঁরা মবের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিয়েছে।
যদিও আশ্চর্যজনকভাবে এই দ্বন্দ্ব মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মিটে যায়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান পর পর তিনটি বৈঠক করেন। প্রথমটি গত রবিবার বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে। এরপর সোমবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সঙ্গে। আর এই বৈঠকগুলির পরই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া বিবৃতি বদলে যায়। নতুন বিবৃতিতে বলা হল, এ সাক্ষাতে প্রধান উপদেষ্টা চলমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অবদানের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলা হয়েছে, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান উপদেষ্টাকে আশ্বস্ত করেছেন যে সেনাবাহিনী সর্বাত্মকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের পাশে থাকবে।
ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, সরকারের জারি করা প্রথম বিবৃতির সঙ্গে দ্বিতীয় বিবৃতির মিল নেই। প্রথমে বলা হয়েছিল, যে বা যারা নূরের উপর হামলার ঘটনায় জড়িত তাঁদের পরিচয় না দেখে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সেনাপ্রধান-প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ পরবর্তী বিবৃতিতে বলা হল, সেনাবাহিনী সরকারের পাশে থাকবে। মনে করা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে সেনার দাবিকেই মান্যতা দিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছেন, মুহাম্মদ ইউনূস ও ওয়াকার উজ জামান নিজেদের মধ্যে নাটক করছেন। আসলে তাঁরা একই বৃন্তের দুটি কুসুম।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post