পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল টানা ৩৪ বছর। এটা যে নজিরবিহীন ঘটনা, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বামেদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয় তারা শুধুমাত্র জনসমর্থনের জেরে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিল না। ভোটের সময় করত রিগিং। যদিও বামফ্রন্ট নেতৃত্ব সেই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। এখন আবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে হাত, কাস্তে, পদ্মের মিল। তারা প্রতি বিধানসভা ভোট বা পঞ্চায়েত ভোটে শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে রিগিংয়ের অভিযোগ তোলে। আর শাসকদল যথারীতি সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যা হল তাতে বাংলার প্রতিটি রাজনৈতিকদল তো বটেই এমনকী জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দল লজ্জা পাবে। লজ্জা পাবে পরীক্ষার হলে টুকলির ঘটনাও। পদ্মাপারে যে হারে গণভোটে গণকারচুপি হয়েছে, তা প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেটা হয়নি, তা হল বুথ থেকে ব্যালটবাক্স বাড়ি নিয়ে যাওয়া। সেটা হলে ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে যেত।
গণকারচুপি শুরু হয় বুধবার রাত থেকে। মোটা দাগে যার পরিচয় ছাপ্পা। ভোটের আগের দিন বাংলাদেশে বইতে শুরু করে “ব্যালট নাও, ছাপ্পা দাও”। একজনের পক্ষে কত ছাপ্পা ভোট দেওয়া সম্ভব? তাই, বুথে বুথে ছিল লোকলস্কর। যে দলের জমি যেখানে শক্তি, সেই দল নির্বিবাদে ছাপ্পা দিয়েছে। ছাপ্পার মাস্টারদের সঙ্গে ছিল অস্ত্র। মানে বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই। তদারকি সরকার প্রধান ইউনূস বলেছিলেন ভোট হবে অবাধ ও সুষ্ঠু। ভোট হবে উৎসবমুখর পরিবেশে। হয়তো উনি বলতে ভুলে গিয়েছিলেন বা সচেতন ভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন এটা বলতে যে অবাধ, সুষ্ঠুভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ছাপ্পা ভোট হবে। এতো ‘সুন্দর’ ভোট বাংলাদেশে কবে হয়েছে, সেটা কেউ মনে করতে পারছে না। সেনাপ্রধান ওয়াকার ভোট দিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, “সবাইকে অনুরোধ করব, সম্মানিত প্রত্যেক ভোটারের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা নির্ভয়ে পোলিং স্টেশনে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।” ভোটারদের কষ্ট করে বুথে যেতে হয়নি। বড়ো, ছোটো সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গতকাল রাত থেকেই মেজাজ ছিল তুরীয়। তারা নিশ্চিত ছিল যে মাঠে পুলিশ থাকবে। আনসার থাকবে। থাকবে বাহিনী। তবে তারা জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবে, সে ব্যাপারে তারা আরও বেশি নিশ্চিত ছিল। তাই, রাত থেকে তারা মেজাজে একের পর এক ব্যালটে ছাপ্পা মেরে গিয়েছে।
শুধু কি ছাপ্পা? ছাপ্পার মতো বোমাও পড়েছে দেদার। চলেছে গুলি। কোথাও আবার রাজনৈতিক কর্মীকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে টাকা। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার বিকেল থেকেই বিক্ষিপ্ত ভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজশাহীর চারঘাটে বিএনপি কর্মী বিরাজ উদ্দীনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। অভিযোগের তির জামাতের দিকে। আবার, চট্টগ্রামের রাউজানে প্রবাসী বিএনপি কর্মীর ফাঁকা বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশের সেনা। গোপালগঞ্জ সদর এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলার চারটি ভোটকেন্দ্রের সামনে বুধবার সন্ধ্যার পর উত্তেজনা ছড়ায়।
“উৎসবমুখর” পরিবেশে ভোটের বলি চার। চারটি মৃত্যু কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সরাইলে। গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, ঢাকার মুন্সিগঞ্জে শিলাবৃষ্টির মতো পড়েছে বোমা। খুলনার মেহেরপুরের এক বুথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে যায় বিএনপি এবং জামায়াত। আওয়ামী লীগের দাবি, ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। তাদের দাবি, বুধবার রাত থেকেই শুরু হয় ছাপ্পা ভোট। নির্বাচন চলাকালীন সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা একাধিক পোস্ট করে। আওয়ামী লীগের প্রশ্ন – “ এটা ভোট না কি দখলদারি ?” তাদের অভিযোগ, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বুথগুলিতে সাধারণ মানুষের দেখা পাওয়া যায়নি। অথচ ব্যালটে পড়ছে ভোট। সবচেয়ে বড় বিতর্ক দানা বেঁধেছে বরগুনা-১ কেন্দ্রের একটি ভিডিয়ো ঘিরে। ভিডিয়োটির সত্যতা যাচাই করেনি নিউজ বর্তমান আওয়ামি লিগের দাবি, বরগুনার গগন স্কুল কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতেই প্রিসাইডিং অফিসারকে দিয়ে ফাঁকা রেজাল্ট শিটে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে।আওয়ামি লিগের এই জোরালো অভিযোগ এবং ভাইরাল ভিডিয়ো নিয়ে প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।












Discussion about this post