বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ভোটের বিস্তারিত দিনক্ষণ বা রোড ম্যাপ নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার এবং তাঁরাই যথা সময়ে ঘোষণা করবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, এই ঘোষণা করে মুহাম্মদ ইউনূস এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারতে চেয়েছেন। ফলে এবার বাংলাদেশে আসল খেলা শুরু হল।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের এই মুহূর্তে অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ডিসেম্বর বা তার আগে ভোট চেয়ে জোরালো দাবি তুলেছিল। একই বক্তব্য ছিল বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের। একমাত্র জামায়াতে ইসলামি এপ্রিলের মধ্যে ভোট চেয়েছিল। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, শুধুমাত্র জামাতের লাইনে গেলেন। আর সেনাবাহিনী ও বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে থাকলেন। যদিও ইউনূসের ঘোষণার পর পরই বিএনপি জানিয়ে দিয়েছে তাঁরা ডিসেম্বরে নির্বাচনের দাবি থেকে এক চুল সরবে না। অর্থাৎ সরাসরি সংঘাত।
এদিন মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ফের আওয়ামী লীগের কথা তোলেন। তাঁর কথায়, এখানে মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে যতবার গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে তার সবগুলোরই প্রধান কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। এর জেরে বারবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল বর্বর ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়েছিল। পাশাপাশি সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন এই তিনটি ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এদিন প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ছিল অনেক দিক থেকে কৌশলগত। এর আগে তিনি ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলছিলেন বারবার। অপরদিকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীর বক্তব্য ছিল, নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। বাকি সংস্কার পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে করবে। প্রায় একই দাবি ছিল বিএনপি-সহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের। বিএনপি তো ডিসেম্বরে নির্বাচন চেয়ে এসপার ওসপার করতে চাইছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা লোভী, তিনি লন্ডন যাত্রা করার আগে সু কৌশলে এপ্রিলে ভোটের কথা জানিয়ে দিলেন। এবার তিনি লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে রফা করতে পারবেন বলেই মনে করছে একটি অংশ। অপরদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একাধিকবার বলেছিল তারাই নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষণা করবেন। কিন্তু ইউনুস সাহেব এদিন নির্বাচন কোন মাসে হতে পারে সেটাই শুধু জানালেন, বাকি দায়িত্ব তিনি নির্বাচন কমিশনের কাঁধেই চাপিয়ে দিলেন। অর্থাৎ ধরি মাছ না ছুঁই পানির মত এই নির্বাচনও বিশ বাও জলে।
নির্বাচন যে এপ্রিল মাসেই হবে এমন দাবি হলো করে বলতে পারছেন না কেউ। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আড়ালে থেকে এবার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে সময় পিছতেই পারে। এই নির্বাচনের মাস ঘোষণা যে একটি ভাওতা তা ইউনুস সাহেবের অন্যান্য কয়েকটি বিষয়ে বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। যার প্রতি একটি হল জুলাই সনদের ঘোষণাপত্র। মুহাম্মদ ইউনুস এদিন পরিষ্কার করে দিয়েছে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই জুলাই সনদ ঘোষিত হতে যাচ্ছে সেটা তিনি স্পষ্ট করেছেন।
অর্থাৎ তাঁর কাঁধে থাকা মূল দায়িত্ব বা কাজটি তিনি নির্বাচনের আগেই শেষ করতে চাইছেন। আবার চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে, সেটাও এদিন খণ্ডন করলেন মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা এদিন স্পষ্ট করে দিলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী সংস্থার হাতে গেলেও তা সুরক্ষিত থাকবে। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই সেখানে সৌদি সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড ঢুকে পড়েছে। যার বিরোধিতা করছে বিএনপি ও সেনাবাহিনী। অর্থাৎ, এই চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যুতেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থেকে বিএনপি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে খোলা চ্যালেঞ্জ দিলেন। যা সংঘাতের আবহ আরও তীব্র করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। অন্যদিকে রাখাইন মানবিক করিডোর নিয়ে এদিন তাঁর ধোঁয়াশাপূর্ণ মন্তব্য বুঝিয়ে দিল ওই করিডোর দেওয়া নিয়ে তাঁর অবস্থান ঠিক কি। রাখাইন করিডোর এখনও ঠান্ডা ঘরে যায়নি, যেটাকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান “দি ব্লাডি করিডোর” বলে উল্লেখ করেছিলেন। অর্থাৎ, নির্বাচনের একটা সম্ভাব্য মাস ঘোষণা করলেও মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ থেকে বোঝা যায়, আগামী দিনগুলি আরও বড় সংঘাতের রাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন দেখার, কোথাকার জল কথায় গড়ায়।












Discussion about this post