গত বছরের কথা। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী পদে তখন হাসিনা। তাঁর মুখ থেকে শোনা গিয়েছিল ‘এরা রাজাকারের বাচ্চা’। কাদের উদ্দেশ্য করে তিনি এই কথা বলছেন, সেটা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। এক বছর বাদে হাসিনার মুখ নিঃসৃত সেই সংলাপ শোনা গেল নীলা ইসরাফিলের কণ্ঠে। জামাতের সঙ্গে এনসিপির জোট প্রসঙ্গে তিনি হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গীকে সঠিক আখ্যা দেন। গত রবিবার ২৮ সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ইসরাফিল তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দিতে গিয়ে জানান, ‘হাসিনাই সঠিক। এরা সবাই রাজাকার। রাজাকারের বাচ্চা। রাজাকারের নাতিপুতি। ’
এই পোস্টের আগে তিনি আরও একটি পোস্ট করেন। সেটা ২৭ জুলাই। নীলা ইসরাফিল লিখেছেন, ‘২৭ জুলাই আমার অবস্থানটি কোনও তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়, এটি একটি নৈতিক অ্যালগরিদমের অনিবার্য ফলাফল। রাজনীতি যদি একটি সিস্টেম হয়, তবে সেই সিস্টেমে ন্যায়বিচার হল মৌলিক ভ্যারিয়েবল। যে সিস্টেমে এই ভ্যারিয়েবলটি শূন্যে নেমে আসে, সেখানে আদর্শ, নীতি কিংবা গণতন্ত্র সবই গাণিতিকভাবে ভেঙে পড়ে। ’
ইসরাফিল আরও লিখেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে যখন নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপী়ডন বা সামাজিক চরিত্রহননের অভিযোগ ওঠে এবং সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শূন্য থাকে, তখন সেটি কেবল নৈতিক ব্যর্থতা নয়, সেটি একটি স্ট্রাকচারাল ফল্ট। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, যেখানে শাস্তির সম্ভাবনা শূ্ন্য, সেখানে অপরাধের সম্ভাবনা সর্বোচ্চ হয়। এই প্রেক্ষাপটে একজন নারীকে হেয় করার পরেও যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দলীয় প্রশ্রয়ে বহাল রাখা হয়, তবে দলটি তিনটি বার্তা দেয়। তা হল অপরাধ দণ্ডনীয় নয়, ক্ষমতা নৈতিকতার উর্ধ্বে, নারী নিরাপত্তা একটি ঐচ্ছিক বিষয়। এই তিনটি উপাদান একত্রে কোনও রাজনৈতিক আদর্শ নয়, এটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক নৈরাজ্য।’
এখানেই শেষ নয়, নীলা তাঁর ফেসবুক পোস্টে এও বলেছেন, ‘আজ জারা তাসনীমসহ ছয়জন নারীর এনসিপি থেকে পদত্যাগ সেই একই সমীকরণের ফল। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এটি একটি প্যাটার্ন রিকগনিশন। যেখানে একের পর এক নারী একই কারণে সরে দাঁড়াচ্ছেন, সেখানে সমস্যাটি ব্যক্তি নয় সমস্যাটি সিস্টেমিক। নৈতিক অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানোকে অনেকেই দুর্বলতা ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি র্যা শনাল চয়েস মডেল। যে কাঠামো ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ, সেখানে থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই হলো সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত। কারণ নৈতিকতা কোনো অলংকার নয় এটি রাজনৈতিক স্থায়িত্বের ভিত্তি।’
জামাতের সঙ্গে এনসিপির জোট নিয়ে তিনি একা নন, দলের আরও কয়েকজন নেত্রী রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন যে উদ্দেশ্য সংগঠিত হয়েছিল, জামাতের সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন, সেই উদ্দেশ্য এবং আদর্শকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। আর এই জোটের আবহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে একটি পুরনো স্লোগান – এক বোতলে দুই ছিপি, জামায়াত আর এনসিপি।
কিছুদিন আগে হাসনাত হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ভারতের যে সব সেপারেটিস্ট রয়েছে, বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে তারা সেভেন সিস্টার্সকে আলাদা করে দেবে। এখন বাংলাদেশে অনেকেই বলছেন, হাসনাতের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে। নিজের দলের সিস্টার্সরা আজ আলাদা হয়ে গিয়েছে। আর বোতলের ছিপ একটাই। আর এই নিয়ে সমাজ মাধ্যমে শুরু হয়েছে হাসাহাসি। নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে এনসিপি এখন পুরনো রাস্তাতেই হাটল শুরু করেছে। আদর্শ আর ক্ষমতার সমীকরণে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে যে কিছু নেই, জামাতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি সেই বার্তাই দিল। এই পুরনো প্রবাদি মনে করিয়ে দিল জোট। বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে এখন সব থেকে আলোচনার বিষয় এই জোট।












Discussion about this post