রাত পোহালেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। তার একদিন আগেই একটা নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হল সে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মঙ্গলবার বিকেলে আচমকা পদত্যাগের ঘোষণা করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। উপাচার্য কার্যালয় সংলগ্ন অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একদিন আগে এ ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। সে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, জামাতপন্থী শিক্ষাবিদ। তাঁকে এই পদে জামায়াত নিয়ে এসেছিল। তাঁর পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশ কি তবে ভোট পরবর্তী কোনও অঙ্কের দিকে ইঙ্গিত করছে? যদিও বিতর্ক শুরু হতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়, পদত্যাগ করেননি উপাচার্য, তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যা গণমাধ্যমগুলি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ঢাবির উপাচার্য বলেছিলেন, ‘আমি সরে দাঁড়াচ্ছি, যেন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার তাদের নিজেদের মতো করে প্রশাসন সাজাতে পারে’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পাঁচদিন পর ১০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল পদত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তী সময় ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানকে সাময়িকভাবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি তথা আচার্য সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এর আঠারেো মাস পর এসে যখন বাংলাদেশে নির্বাচন হতে চলেছে, তখন তিনি নিজে থেকেই সরে দাঁড়ানোর কথা বললেন। কিন্তু কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান জামাতের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের যা রাজনৈতিক হাওয়া তাতে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে। সমস্ত সমীক্ষা ও জরিপ এই দিকেই ইঙ্গিত করছে। ফলে তিনি আগেভাগেই সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন। যাতে ভোটের পর নতুন করে সংস্কারপর্বে তাঁকে বেইজ্জত না হতে হয়। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে এই দাবিও করছেন, তিনি পালাতে চাইছেন। সেদিনের সংবাদসম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, তিনি এমন একটা ক্রান্তিকালে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। পুরোটা চালু না হলেও অনেকটাই স্বাভাবিক।
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, তিনি দায়িত্বে আসার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে জামাতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও ঢাবির উপাচার্যের দাবি, তিনি কখনোই এ দায়িত্বকে নিয়মিত চাকরি হিসেবে দেখেননি। তিনি বলেন, উপাচার্যের দায়িত্বটি আমার কাছে ছিল একটি আমানতের মতো। ছাত্রদের অনুরোধ এবং ভালোবাসায় আমি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। এ সব ঠিক হলেও তাঁর সরে দাঁড়ানোর সময়টা নিয়েই মূল চর্চা চলছে। এমন একটা সময় জামাতী তকমা পাওয়া উপাচার্য পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন যে সেটা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর পেছনে বড় কোনও রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকেত রয়েছে? অনেকেই বলছেন, অবশ্যই আছে। ভোটের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা হয়তো আগাম আঁচ করতে পারছে জামায়াতে ইসলামী। সেই কারণেই গুরুত্বপূ্র্ণ পদে তাঁদের যারা বসেছিলেন, তাঁরা এখন সরে যাওয়ার কথা বলছেন। এটা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইঙ্গিতবাহী।












Discussion about this post