একসময় তাঁকে একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেত্রী হিসেবে অভিহিত করা হতো। তিনি একজন বিপ্লবী নেতার কন্যা, যাকে ১৯৭৫ সালে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খতম করা হয়েছিল। শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকেই হত্যা করা হয়েছিল। কেবলমাত্র বেঁচে যান দুজন। আমরা শেখ হাসিনা এবং তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কথা বলছি। মুজিব হত্যার পর পদ্মা নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনা খাদের কিনারা থেকে উঠে এসে আবারও আওয়ামী লীগের হাল ধরেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, একবার নয়-তিন তিন বার। সেই শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে একদল ষড়যন্ত্রকারী মুজিব হত্যার ৫০ বছর পর হত্যার চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু এবার আর সেটা করা সম্ভব হয়নি। কারণ, মাঝখানে ভারত সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। গত বছর ৫ আগস্ট কিভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একেবারে শেষ মুহূর্তে বঙ্গভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসেন, তা আজ অনেকের কাছেই জানা বিষয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে সরাসরি যুদ্ধ করে ভারত যেমন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। তেমনই ১৯৭৫ সালে মুজিবুর রহমানের প্রাণ বাঁচাতে না পারলেও তাঁর দুই কন্যার প্রাণ বাঁচিয়েছিল ভারত। সে গল্পও আজ সকলের জানা। তেমনই ২০২৪ সালেও ভারতের জন্য ফের একবার প্রাণে বাঁচলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা তথা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি এবং দেশ ত্যাগের ১৫ মাসের মাথায় বাংলাদেশের এক আদালত তাঁকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে। এবারও তাঁর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। ফলে বাংলাদেশে যত ষড়যন্ত্র, যত চক্রান্ত, প্রায় সবগুলিই ভারতের সামনে এসে কেমন যেন অসহায় হয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রথম মামলায় শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজা তো ঘোষণা হল, হয়তো বাকি মামলাতেও তাঁর সর্বোচ্চ সাজা হবে। কিন্তু সেই সাজা কার্যকর হবে তো?
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিচার এবং সাজা ঘোষণা করা হলেও এখন তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে একমাত্র নয়াদিল্লি যদি তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেটা কি আদৌ হবে, এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এখন শেখ হাসিনা দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থার একটি অনুঘটকে পরিণত হয়েছেন। কারণ ঢাকা দাবি করছে হাসিনাকে তাঁর অপরাধের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তাই তাকে প্রত্যর্পণ করা হোক। অপরদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী একের পর এক আন্তর্ডাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়ে দাবি করছেন, সেই অপরাধ তিনি করেননি।
এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা হাসিনার বাবা, মা এবং তাঁর তিন ভাইকে তাঁদের ঢাকার বাড়িতে হত্যা করে। হাসিনা এবং তাঁর বোন সেই সময় পশ্চিম জার্মানি সফরে থাকাকালীন বেঁচে যান। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর, জেনারেল জিয়াউর রহমান। যিনি আবার হাসিনার ভবিষ্যৎ চিরশত্রু খালেদা জিয়ার স্বামী। তিনি ক্ষমতায় এসেই মুজিবরের হত্যাকারীদের কয়েক দশক ধরে রক্ষা করার জন্য একটি আইন পাস করেছিলেন। অবশেষে ১৯৮১ সালে যখন হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন জাতি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা ও আদর্শের পক্ষে সোচ্চার ছিল। আবার তিনি বাংলাদেশের এমন একটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রবেশ করেছিলেন যেখানে আরেকজন মহিলা, জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে এক করুণ ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। পরবর্তী ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশ দুই নারীর মধ্যে ব্যক্তিগত ধ্বংসাত্মক দ্বন্দ্ব দেখলো। অনেক দমন-পীড়ন এবং লড়াইয়ের পর শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জয়লাভের দিকে নিয়ে যান এবং প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তী ১৫ বছর ধরে, তিনি কঠোরতার সাথে বাংলাদেশ শাসন করেন। বাংলাদেশে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগের সূচনা করেন। একই সাথে, তিনি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন প্রদান করেন এবং তাঁদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান এবং চিনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে নয়াদিল্লিকে শক্তিশালী করে তোলেন। কিন্তু কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক সাফল্যের জন্য তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছে চরম মূল্য। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং মিডিয়া এবং বিরোধী দলের ব্যক্তিত্বদের হয়রানির। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, হাসিনা ভারতের সবচেয়ে দৃঢ় আঞ্চলিক মিত্রদের একজন ছিলেন। তার সরকার ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যারা বাংলাদেশী ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পূর্ব ভারতে বিস্তৃত সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার জন্য হাসিনার প্রশংসা করেছিলেন। এখন হাসিনা সরকারের পতনের ফলে নয়াদিল্লিতে উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং পুনরায় বাংলাদেশে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত কোনও ভাবেই চাইবে না, হাসিনার ফাঁসির সাজা কার্যকর হোক। তাই তাঁকে ইউনূস সরকারের হাতেও তুলে দেবে না নয়া দিল্লি। প্রয়োজনে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকেই উৎখাত করতে পারে ভারত। এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post