২০২৪ সালের অক্টোবর মাসেই জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলম নিজেদের ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, “যেই পথে গেছে আপা, সেই পথে যাবে জাপা”। বলাই বাহুল্য, এথানে আপা বলতে তাঁরা শেখ হাসিনা এবং জাপা বলতে তাঁরা জাতীয় পার্টিকে বুঝিয়েছিলেন। এর দশ-এগারো মাস পরে এসে আচমকা হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার ডাক উঠল। যা নিয়ে যথেষ্টই কৌতুহলের জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। পদ্মাপাড়ের হাসিনা বিরোধীদের দাবি, ‘জাপা’ আদতে আওয়ামি লিগের বি টিম। এও দাবি করা হচ্ছে যে, একসময় বিএনপিকে ঠেকাতে ‘জাপা’কে ব্যবহার করতেন শেখ হাসিনা। এবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে জাতীয় পার্টির আড়ালেই তাঁদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। সাম্প্রতিক সময়ে গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘর্ষে জড়িয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির সমর্থকরা। এরপরই গণ অধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর জাতীয় পার্টির সদর দফতরের সামনে বিশাল সংখ্যক সমর্থক নিয়ে হাজির হয়। সেখানেই তাঁরা মব সৃষ্টি করে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবিতে অবস্থান করে। এই আবহেই সেনাবাহিনী অবস্থান তুলতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। যার ফলে গুরুতর আহত হন গণ অধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর। এই ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন করে উত্তাল হয়েছে। জাপা অর্থাৎ জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের মতোই নিষিদ্ধ করার দাবিও জোর পেয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবলমাত্র আওয়ামি লিগের দোসর হওয়াই একমাত্র কারণ নয়, ‘জাপা’ নিষিদ্ধের দাবির পেছনে আছে বাংলাদেশের ভোটের সূক্ষ্ম হিসাব। জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি স্বীকার করতে রাজি না হলেও জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির নেতারা এই দাবির পেছনের সমীকরণটির মান্যতা দিচ্ছেন। বিএনপি নেতা রাহুল কবীর রিজভী দাবি করছেন, নুরুল হক নূর এমন কোনও অপরাধ করেননি যে তাঁকে এভাবে মারতে হল। তিনি এই ঘটনাকে একটা বৃহৎ পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে দাবি করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে হঠাৎ জাপার আলোচনায় আসার পেছনে কয়েকটি পটভূমি কাজ করছে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে তাদের ওপর চাপ তৈরির বড় কারণ দরকষাকষিতে লাভবান হওয়া। একাধিক দলের নির্বাচনে না যাওয়ার হুমকিকে তারা এর অংশ হিসেবে দেখছে। এর সঙ্গে নতুন অস্ত্র হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে জাপা নিষিদ্ধের দাবি। প্রথমে, দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি সামনে আনা হয়েছে। রাস্তা থেকে সেই দাবিকে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার দরবারে হাজিরও করা হয়েছে। আর এই দাবি তুলছে মূলত জামায়তে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি। জামাত সরাসরি কিছু না বললেও এনসিপি নেতারা কিন্তু খোলাখুলি জাপাকে নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় পার্টি বরাবরই আওয়ামী লীগ জোটের অংশ। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকায়, শেখ হাসিনা চাইছেন জাতীয় পার্টির ব্যানারে সে দেশে নিজেদের জনমত গড়ে তুলতে। আবার যদি আসন্ন নির্বাচনেও লীগ অংশ গ্রহন করতে না পারে, তাহলে জাতীয় পার্টির আড়ালেই তাঁরা নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট দলটির পক্ষে গেলে জামাত ও এনসিপির পক্ষে বিরোধী দল হওয়ার সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। এমনকি বিএনপির পক্ষেও ক্ষমতায আসা দুস্কর হতে পারে। এখন যা হচ্ছে তা মূলত ভোটের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের এক ধরনের কৌশল।












Discussion about this post