ক্ষমতা হারানোর প্রায় দেড় বছর পর বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আচমকা একের পর এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি শুরুটা করেছিলেন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপির মতো বিশ্ববন্দিত দুই সংস্থাকে সাক্ষাৎকার দিয়ে। একই দিনে তিনি সাক্ষাৎকার দেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য এক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকেও। এরপর তিনি একে একে একাধিক আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় গমমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়ে চলেছেন। আর প্রত্যেকেই তাঁর সাক্ষাৎকার গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করছে। রয়টার্স এবং এএফপির থেকে হাসিনার সাক্ষাৎকারের অংশ নিয়ে বিশ্বের একাধিক সংবাদমাধ্যম খবর করেছে। এই বিষয়টি এখন চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কূটনৈতিক মহল শেখ হাসিনার যাবতীয় সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে অভিমত দিয়েছেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির জন্য, গণঅভ্যুত্থানে ইন্ধন দেওয়ার জন্য একবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেননি। এটা কিন্তু গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করাচ্ছে কূটনৈতিক মহলকে।
সম্প্রতি মার্কিন সংস্থা সিএনএন ও ভারতের নিউজ-১৮ গ্রুপের যৌথ প্রযোজনা সিএনএন-নিউজ ১৮ সংবাদমাধ্যমকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ওয়াশিংটনের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে বর্ণনা করবেন,আমেরিকা কি কেবল রাজনৈতিক সংস্কারের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, নাকি “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের” নামে আপনাকে বহিষ্কার করতে চাওয়া সামরিক-বুদ্ধিজীবী ব্লককে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন, সেই সঙ্গে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞারও নিদর্শন রেখেছেন বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তিনি বলেন, আমাদের সবসময়ই ধারাবাহিক মার্কিন প্রশাসনের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আরও বলেন, আমাদের বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই যে মার্কিন সরকার বা অন্যান্য বিদেশী শক্তি সক্রিয়ভাবে এতে জড়িত ছিল। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প, যার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তিনি প্রকাশ্যে ইউনূসের প্রতি তাঁর অপছন্দ প্রকাশ করেছেন। এরপরই হাসিনার যুক্তি, অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে ইউনূস প্রভাবশালী পশ্চিমা ভক্তদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তাঁরাই ইউনূসের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলিকে গণতান্ত্রিক যোগ্যতা হিসেবে ভুল করেছিলেন। যদিও শেখ হাসিনার দাবি, এখন এই ভ্রান্তি দূর হচ্ছে। তাঁরা বুঝছেন, একজন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান যিনি তার মন্ত্রিসভায় উগ্রপন্থীদের স্থান দিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধান ভেঙে দিয়েছেন এবং সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের সময় নীরব ছিলেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা শেখ হাসিনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে একাধিকবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে আসছিলেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের জন্য। কিন্তু আচমকা তিনিই সেই বিষয়ে চুপ হয়ে গেলেন। আর এটা করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বদলের পরই। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহাপরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, কয়েক দশক ধরে অন্য দেশের ‘সরকার পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জের যে নীতি অনুসরণ করছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির সমাপ্তি ঘটেছে। গত ৩১ অক্টোবর বাহরিনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলন ‘মানামা সংলাপে’ তুলসী গ্যাবার্ড এ কথা বলেন। তিনি আরও দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সম্প্রসারণ। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তুলসী বলেছিলেন, এমন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অগণিত মানুষের প্রাণহানি এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়েছে। বদলে যুক্তরাষ্ট্র তেমন কিছু পায়নি, বরং আইএসআইএস বা ইসলামিক স্টেটের মতো ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তুলসীর এই বক্তব্য সামনে আসার আগেই ভারত সরকার আঁচ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি সম্পর্কে। যা শেখ হাসিনার কানেও তুলে দেওয়া হয়েছিল। এরপরই আমরা দেখলাম, হাসিনার সাক্ষাৎকার নিতে উদগ্রীব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলি। অর্থাৎ খেলা এবার ঘুরছে।
সিএনএন-নিউজ১৮-এ সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা জানান, সংস্কারের আড়ালে এটি একটি “পরিকল্পিত অভ্যুত্থান” ছিল। যা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে জড়িত করে এবং বর্তমান শাসনামলে ক্রমবর্ধমান চরমপন্থী শক্তিগুলিকে একত্রিত করে বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খেয়াল করে দেখুন, তুলসীর সুরেই হাসিনা বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থার উত্থান টেনে এনেছেন। ভারতও এই মুহূর্তে সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে বধ্যপরিকর। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাত তুলে নিতেই ইউনূসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার প্রসঙ্গই সুকৌশলে সামনে আনলেন শেখ হাসিনা। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের আগের ভুল পরিশোধ করে হাসিনাকেই বাংলাদেশে ফেরাবে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post