আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি, যার অবস্থান অস্ট্রিয়ার রাজধানী হেগে। এর সঙ্গে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। প্রথমটির উদ্দেশ্য, বিশ্বের যে কোনও দেশে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বা গুরুতর অপরাধের বিচার করা, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। আর দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য ছিল, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করা। কিন্তু ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে এখন শেখ হাসিনার বিচার চলছে। যিনি এই আদালত গঠন করেছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এক নাটকীয় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে উৎখাত করে এখন তাঁকেই আদালতের কাঠগড়ায় তুলেছেন সেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিগুলি। কিন্তু শেখ হাসিনা হলেন দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। ফলে তাঁকে খাঁটো করে দেখা সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের। তিনি ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনার বিচার করতে চেয়েছেন। আর হাসিনা সরাসরি তাঁকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করার তোড়জোড় শুরু করে দিলেন।
জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে এবার মামলা দায়ের হল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি-তে। আর এই মামলা দায়ের করল বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই মামলা দায়ের করা হয়েছে ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরের কাছে মামলার আবেদনপত্রটি দাখিল করেছেন লন্ডনের প্রখ্যাত আইন ফার্ম ডাউটি স্ট্রিটের আইনজীবী স্টেভেন পাওয়েল কেসি। উল্লেখ্য, রোম সংবিধানের ১৫ নম্বর বিধিতে বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি সে দেশের বাসিন্দা না হন, বা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ না হন, কিন্তু তিনি যদি জানতে পারেন সে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনা ঘটছে, যার বিচার কোনও ভাবেই সে দেশে করা সম্ভব নয়, তাহলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। বলে রাখি, ১০৯০ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। আইসিসি-র প্রসিকিউটরের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে, যে তিনি যেন আওয়ামী লিগের নেতাকর্মী ও শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রতিশোধমূলক হিংসাত্মক ঘটনার তদন্ত শুরু করেন। আওয়ামী লীগের মতে বাংলাদেশে ঘটমান এই সব ঘটনা আইসিসি-তে নথিভুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েই পড়ে।
আইসিসি-র প্রসিকিউটরের কাছে দেওয়া এই চিঠিতে বলা হয়েছে, এটা বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে যে, উল্লেখিত অপরাধগুলি হত্যা, কারাদণ্ড এবং নিপীড়নের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য। যার ফলে প্রসিকিউটর কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের বক্তব্য, বাংলাদেশের আদালতে বাস্তবসম্মত বিচারের সম্ভাবনা নেই। জানা যাচ্ছে, আইসিসি-র কাছে পাঠানো চিঠিতে তথ্যপ্রমান-সহ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ৪০০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর হত্যার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, যাদের অনেকেই সহিংস জনতা কর্তৃক পিটুনি ও গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার শিকার হয়েছেন। এমনকি ভিডিও প্রমাণ সহ কয়েকজন সাক্ষীদের সাক্ষ্যও দাখিল করা হয়েছে আইসিসি-র নিকট। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে গত বছর জুলাই মাস থেকে লাগাতার হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছে। যদিও মামলায় বলা হয়েছে মূলত আওয়ামী লিগের নেতা কর্মী সমর্থকদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন চলছে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের লোকজনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে সকলকে অপদস্থ করার চেষ্টা করছে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ শেখ হাসিনা সরকারের সময়েই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধানে স্বাক্ষর করেছিল। এবার তিনিই মামলা দায়ের করে উল্লেখ করেছেন, যে বাংলাদেশে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, বিনা অপরাধে কারাবন্দি করা এবং নিপীড়নের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে চলেছে। ফলে এইসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা উচিত আইসিসির প্রসিকিউটরের।
অন্যদিকে, আগামী ১৩ নভেম্বর ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় সাজা ঘোষণার দিন জানাবেন ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারপতি। অনেকেই ধারণা করছেন, এই রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাঁসি বা সর্বোচ্চ সাজাই হবে। ফলে তার আগেই অস্ট্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করে পাল্টা প্রতিঘাত দিল আওয়ামী লীগ। আর ব্রিটেনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার এই বিষয়ে যথেষ্টই দক্ষ। ফলে খেলা এবার জমে গেল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post