বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা তাদের বায়না না মেটালে খালি ঘ্যান ঘ্যান করে। অনেকে তো আবার কাঁদতে কাঁদে মাটিতে শুয়ে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করতে থাকে। বায়না আদায় করেই তবে তারা শান্ত হয়। সে বায়না লজেন্স কিনে দেওয়া নিয়ে হতে পারে, হতে পারে ক্যাডবেরি চাওয়া নিয়েও। বায়নার যেমন শেষ নেই, তাদের কান্নারও শেষ নেই।
বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটে সেই বাচ্চা ছেলের মতো। পদ্মাপার থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয়বার ঢাকা থেকে দিল্লির জন্য এসেছে চিঠি। চিঠি পাঠানো হয়েছে গত শুক্রবার। সেই চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে গত বছরের ২০ এবং ২৭ ডিসেম্বর দেওয়া চিঠির প্রসঙ্গ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনা এবং তাঁর আমলের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে আছেন। মনে করা হচ্ছে আসাদুজ্জামান খান কামালও দিল্লিতে রয়েছে। বিগত ১৫-১৬ মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। যে সব সাক্ষাৎকারে একদিকে যেমন তদারকি সরকার এবং সরকারের মাথা ইউনূসকে তেড়ে গাল দিয়েছেন, অপরদিকে দেশে ফেরার কথাও জানিয়েছেন। ব্যাপারটা এমন নয়, যে দিল্লি তাঁকে দেশে ফেরার জন্য চাপ দিয়ে চলেছে। দিল্লি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বাংলাদেশে ফেরার জন্য কোনওভাবেই চাপ দেবে না। দলাই লামাকে ফেরত চেয়ে চিন বহুবার দিল্লিকে কার্যত হুমকি দিয়েছিল। সাউথব্লক সেই হুমকির কাছে আজ পর্যন্ত মাথা নত করেনি। সেই চাপকে দিল্লি কার্যত নস্যি ঝাড়ার মতো ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। হাসিনার ক্ষেত্রেও সাউথব্লক এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর আমাদের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর তো জানিয়ে দিয়েছেন, ‘শেখ হাসিনা এখানে একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (জুলাই আন্দোলন) এসেছিলেন। আমার মনে হয়, তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে তার পেছনেও সেই পরিস্থিতিই রয়েছে। কিন্তু আবারও বলছি, এটা এমন একটা বিষয় যেখানে তাঁকে মনস্থির করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ (সি হ্যাজ টু মেক আপ হার মাইন্ড)’
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে বিদেশমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের মঙ্গল কামনা করে। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমরা মনে করি, অন্যান্য গণতন্ত্রে মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেদের ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারে। এবং আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে ফলাফল সামনে আসবে, তার পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতি ভারসাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে বাংলাদেশের এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
কিন্তু বাংলাদেশের তদারকি সরকারকে কে বোঝাবে যে হাসিনা বা তাদের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফিরে পাওয়ার জন্য দিল্লিতে তারা যতই নোট ভার্বাল পাঠাক না কেন, দিল্লি ওই সব নোট ভার্বালকে পাত্তাই দেবে না। তাছাড়া হাসিনা তো নিজেই জানিয়েছেন যে তিনি দেশে ফিরতে চান। তাহলে তদারকি সরকার কেন হাসিনার সঙ্গে কথা বলছে না। তাদের তো সরাসরি বঙ্গবন্ধু কন্যার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত। ভারতের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু এর জন্য শর্ত হল গণতন্ত্র সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা। তাছাড়া বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ,বাংলাদেশের জনগণের তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মৌলিক অধিকার রয়েছে।’
যিনি নিজেই বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাহলে ইউনূস এবং তাঁর সরকার কেন দিল্লির সঙ্গে দর কষাকষি করছে?। কেন চিঠির পর চিঠি পাঠিয়ে চলেছে এটা জেনেও যে দিল্লি ওই সব চিঠিকে গুরুত্ব দেবে না। সূত্রে পাওয়া খবর উদ্ধৃত করে একটি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, পুতিন তাঁর দিল্লি সফরে হাসিনার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। এই ব্যাপারে মস্কো যে দিল্লির পাশে রয়েছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তাছাড়া দিল্লির কাছে হাসিনার পরিচয় তিনি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি সেই নেতা যিনি দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সব চেয়ে গুরত্বপূর্ণ হল, তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই নেত্রীকে দিল্লি বাংলাদেশে ঘুরে বেড়ানো হিংস্র হায়নার মুখে খাদ্য করে পাঠিয়ে দেবে, এটা হতেই পারে না।












Discussion about this post