ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০টি প্রকল্প ও চুক্তি ‘বাতিল’ করা হয়েছে। এমনই তথ্য জানিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরই চুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছাত্রনেতা তথা ইউনূস সরকারের অন্যতম উপদেষ্টার এই দাবিতে গোটা বাংলাদেশে শোড়গোল পড়ে গিয়েছে। তবে চুক্তি বাতিল নিয়ে উপদেষ্টা আসিফের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি বাংলাদেশেরই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করবো না। এর অর্থ বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরেই গোলমাল শুরু হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ১০টি চুক্তি যদি সত্যিই বাতিল হয়, তাহলে তা কে করল, ভারত নাকি বাংলাদেশ? আসিফ মাহমুদ বাতিল হওয়া চুক্তি ও প্রকল্পের নামগুলি জানিয়েছেন। সেই প্রকল্পগুলি হল, ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেল সংযোগ প্রকল্প, অভয়পুর-আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ, আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর, ফেনী নদী জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, বন্দরের ব্যবহার সংক্রান্ত সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন চুক্তি, ফারাক্কাবাদ সংক্রান্ত প্রকল্পে বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতা প্রস্তাব, সিলেট-শিলচর সংযোগ প্রকল্প, পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সম্প্রসারণ চুক্তি, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বা মিরসরাই ও মোংলা আন্তর্জাতিক ইকোনমিক জোন এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি জিআরএসইর সঙ্গে টাগ বোট চুক্তি।
ঘটনা হল, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ভারতের দেওয়া লাইন অফ ক্রেডিট বা এলওসি স্কিম। ২০১০ সাল থেকে ভারত এই সুবিধা দিয়ে আসছে বাংলাদেশকে। এখনও পর্যন্ত তিনটি এলওসি চুক্তির মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে মোট ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ সুবিধা প্রদান করেছে। এই অর্থ মূলত, বাংলাদেশের নানা অবকাঠামো উন্নয়ন, রেলপথ, সড়ক, বিদ্যুৎ, শিপিং এবং সামাজিক খাতে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কথায়, এই ঋণগুলোর সুদের হার মাত্র ১ শতাংশ, যা ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড সহ ২০ বছরের মেয়াদে পরিশোধ করা যায়। তবে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদার সংস্থা ও উপকরণের ৭৫ শতাংশ ভারত থেকেই আমদানি করতে হয়। এটাই বর্তমান সরকারের আপত্তি বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলওসি স্কিমের মাধ্যমে সবচেয়ে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের সুবিধা দেয় ভারত। এতে উন্নয়নমূলক কাজ অতি সহজে করা যায়। এই সুয়োগ সুবিধার জন্য ভারত কিছু ফায়দা নেবে না এটা তো হতে পারে না। জানা যাচ্ছে, ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি প্রকল্প আটকে দিয়েছে। মূলত ভারতীয় ঠিকাদার সংস্থাগুলির কাজে বাঁধা সৃষ্টি, চাঁদাবাজির মাধ্যমে কাজ থমকে গিয়েছিল। আর এই কারণেই ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১.৮৮ বিলিয়ন ডলার ছেড়েছে ভারত। যা মোট ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশ। জানা যায়, এই এলওসি স্কিমের অধীনে মোট ৪০টিরও বেশি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল পূর্বতন হাসিনা সরকার। যার মধ্যে ১৫টি সম্পন্ন, ৮টির কাজ চলছিল এবং বাকিগুলো প্রস্তুতি বা টেন্ডার পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪-এর আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভারতীয় ঠিকাদারদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
জানা যায় শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে প্রথম এলওসি চুক্তি হয়েছিল ২০১০ সালের ৭ আগস্ট। মোটি চুক্তির পরিমান ৮৬২ মিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে ছাড়া হয়েছিল ৭৭০ মিলিয়ন ডলার। প্রধানত রেল এবং সড়ক খাতে ব্যয় হয়েছিল সেই অর্থ। বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, আইসিটি, স্বাস্থ্য এবং প্রফেশনাল শিক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য দ্বিতীয় এলওসি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ৯ মার্চ। মোট চুক্তির পরিমান ছিল ২ বিলিয়ন ডলার। এই চুক্তির অধীনে ছাড়া হয়েছে ৫২০ মিলিয়ন ডলার। তৃতীয় এলওসি চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর। বাংলাদেশের রেল, সড়ক, বিদ্যুৎ, শিপিং এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই চুক্তির মাত্র ৫৫০ মিলিয়ন ছাড়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া, খরচ বৃদ্ধি, ঠিকাদারের অনীহা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাতিল হয়েছে। যা কেবলমাত্র বাংলাদেশ সরকার নেয়নি। ভারতও কিছু ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post