তৈরি ভারতীয় সেনাবাহিনী। সরকারি সূত্রের খবর, প্রত্যাঘাতের সম্ভাব্য ‘টার্গেট’-গুলি লক করতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের হিসেবনিকেশ। পহেলগাঁও হামলার পর থেকে গোটা দেশের রক্ত ফুটছে, সে কথা নিজেই বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পহেলগাঁওয়ের নৃশংস ঘটনার যে ভারতবর্ষ মুখ বুজে মেনে নেবে না, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সে বার্তা এসেছে বারবার। মোটামুটি একমত বিরোধী শিবিরও। এখন শুধু প্রত্যাঘাতের পালা। কিন্তু সেটা কবে, কিভাবে, সেটাই শুধু গোপন।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যাবেন না। বিকল্প হিসেবে যুদ্ধের বহুমুখী অভিযানে যেতে পারেন। যাকে প্রতিরক্ষা পরিভাষায় বলা হয় ‘মাল্টিপল অ্যাঙ্গল অপারেশন’। নয়া দিল্লির ওয়ার রুমে এখন তারই প্রস্তুতি তুঙ্গে। কোথায়, কখন ও কিভাবে আক্রমণ হবে, জলপথ, আকাশপথে নাকি স্থলপথে আক্রমণ হবে সেটাই এখন রহস্য। আসলে যুদ্ধ বা সার্জিকাল স্ট্রাইক, কোনওটাই বলে কয়ে হয় না। ফলে পাকিস্তানে এখন ত্রাহি ত্রাহি রব। জোরদার তৎপরতা শুরু হয়েছে সীমান্তের এপারে। কোথাও বিমানে নামছে প্রতিরক্ষা সামগ্রী, কোথাও আবার মজবুত করা হচ্ছে আকাশসীমা। আবার আরব সাগরে তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে ভারতীয় নৌবাহিনীও। ফলে পাকিস্তানকে কার্যত চারদিক দিয়ে ঘিরতে শুরু করেছে ভারত। যে কোনও মুহূর্তে নেমে আসতে পারে চরম আঘাত।
এরমধ্যেই যে খবরটা সামনে আসছে সেটা খুবই আশ্চর্যজনক। যুদ্ধের আবহে পাকিস্তানে শতাধিক সেনা অফিসার ইস্তফা দিয়েছেন। কার্যত রণেভঙ্গ দিয়েই চলে যাচ্ছে একের পর এক পাক সেনা। আরও আশ্চর্য বিষয় হল, পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই পাক সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনীরের দেখা নেই। তিনি কোথায় সেটা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে খোদ পাকিস্তানেই। যদিও ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে পাক সেনা প্রধানের একটি ছবি প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার। কিন্তু তাতেও জল্পনা কল্পনা থামছে না। জেনারেল আসিম মুনির কি বিদেশ পালিয়ে গেলেন? এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউ কেউ। সোমবার একটি রিপোর্ট সামনে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কমপক্ষে ২৫০ জন সেনা অফিসার ইস্তফা দিয়েছেন পাকিস্তানে। শুধু তাই নয়, ইস্তফা দিয়েছে প্রায় ১২০০ পাক সেনা জওয়ানও।
যদিও এটা নতুন কিছু নয় বলেই দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিগত ছয় মাস ধরেই পাক সেনাবাহিনীর অন্দরে জ্বলছে বিদ্রোহের আগুন। বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া এলাকায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই করছে পাক সেনাবাহিনী। সেখানে তাঁদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, পড়ে পড়ে মার খেতে হচ্ছে বালুচ লিবারেশন আর্মি অথবা তেহরিক ই তালিবান বিদ্রোহীদের হাতে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রভিন্সে এই মুহূর্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কোনও রাশ নেই। পুরোটাই কার্যত বিদ্রোহীদের দখলে। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল ইস্তফা দিয়ে পালানোর পালা। যা এখনও অব্যাহত। যদিও পাকিস্তানের এই পলায়ন নতুন কিছু নয়। এটা বহু পুরোনো পরম্পরা।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা মনে করলেই বোঝা যাবে এটা। সেবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিক্রমে প্রায় ৯৩ হাজার সেনা নিয়ে আত্মসমর্পন করেছিল পাকিস্তান। সেই ইতিহাস আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আরও আগের। দুই দেশ একই সঙ্গে স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার বছর ১৯৪৭ সালেই পাকিস্তান কাশ্মীরে সৈন্য পাঠায়। ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর মুজাফফরাবাদে প্রথম শত্রুর আক্রমণের খবর পাওয়া যায়। পরিকল্পিতভাবে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরের বেশিরভাগ অংশ দখল করে। কিন্তু ভারত বাদগাম, নওশেরা, উরি, পুঞ্চ ইত্যাদি দখল করতে সক্ষম হয়। যুদ্ধের পর পাকিস্তানের কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ অংশ ছিল। অন্যদিকে ভারতের ছিল দুই-তৃতীয়াংশ। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। কিন্তু তারা এক-তৃতীয়াংশ অংশই দখল করতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধে ভারতের কাছে হেরেই যায় পাকিস্তান। এরপর ১৯৬৫ সালেও পাকিস্তান পূর্ণ মাত্রায় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল। সেখানেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজিত হয় যারা আমেরিকার প্যাটন ট্যাঙ্ক দিয়ে সজ্জিত ছিল। সেই যুদ্ধে ভারত ১৯২০ বর্গকিলোমিটার এবং পাকিস্তান ৫৫০ বর্গকিলোমিটার দখল করেছিল। ফলে পাকিস্তান সেবারও তাঁদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাই এটি ভারতের জন্যও একটি বিজয় ছিল। এরপর ৭১-এর যুদ্ধ। সেবারও ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরাক্রমে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল পাক বাহিনী। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের কার্গিল যুদ্ধ। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে পাক বাহিনী সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও একের পর এক এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। সেবারও ভারতীয় সেনার পরাক্রম এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধকৌশলে কাশ্মীর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তি। সেখানে পাকিস্তান ধারেকাছে নেই। এই অবস্থায় অসহায় আত্মসমর্পণ করার আগেই পাক সেনাবাহিনী ছেড়ে পালানোর ধুম দেখা যাচ্ছে অতীতের ধারা বজায় রেখেই।












Discussion about this post