রবিবার রাতেও ভারতের মাটি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে পাকিস্তানের সেনা। জম্মু ও কাশ্মীরে লাইন অফ কন্ট্রোল বরাবর গত দু-তিন দিন ধরে শুধুমাত্র রাতের বেলায় সংঘর্ষ বিরতি করে বেদাত গোলাগুলি ছুড়ছে পাকিস্তানি সেনা। ভারতীয় সেনা ও তার যোগ্য জবাব দিয়ে চলেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কাশ্মীরে লুকিয়ে থাকার জঙ্গিদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই পাকিস্তানি সেনার এই কায়দা। কূটনৈতিক স্তরে একাধিক বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সরাসরি সেনা অভিযান বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মত কোন ঘটনা এখনও ঘটায়নি ভারত। কিন্তু বড় কোনও পরিকল্পনা যে ভারতের রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে দিল্লির সাউথ ব্লক ও নর ব্লকের তৎপরতা দেখে। সোমবার ১১টা নাগাদ ফের বৈঠকে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালও। সূত্রের খবর, জঙ্গি দমনে কী কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং পহেলগামে বর্তমান পরিস্থিতি কেমন, সেই সমস্ত তথ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক চলে।
এর আগে রবিবার ভারতীয় সেনার সর্বাধিনায়ক বা চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। রবিবার বিকেলে রাজনাথের দিল্লির বাসভবনে পৌঁছে গিয়েছিলেন জেনারেল অনিল চৌহান। সেখানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, যা নিয়ে রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানী সংবাদমাধ্যমে। যদিও পরে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, পহেলগাঁওয়ে নৃশংস হত্যালীলার পরে পাকিস্তানকে জবাব দিতে কী কী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ভারতীয় সেনার সর্বাধিনায়কের মধ্যে। প্রসঙ্গত রবিবার পাকিস্তানের এক মন্ত্রী আবার ১৩০টি পারমানবিক অস্ত্র ভারতের দিকে তাক করা রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, পাকিস্তানের মিসাইল তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য নয়, ভারতকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্যই ব্যবহার করা হবে।
অনেকেই মনে করছিলেন, ওই পাক মন্ত্রীর হুমকির পরই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ডেকে পাঠান অফ ডিফেন্স স্টাফকে। ফলে এই বৈঠক ছিল যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে রবিবার “মন কি বাত” অনুষ্ঠানে ফের একবার কড়া বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর ভাষণের শুরুতেই পহেলগাঁও হামলার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া জবাব দেবে ভারত! প্রত্যেক ভারতীয়ই নিহতদের পরিবারদের পাশে আছেন। কার্গিল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ছড়িয়ে শোক ও ক্ষোভ। এটা শুধু পর্যটকদের উপর হামলা নয়, দেশের শত্রুরা ভারতের আত্মাকে আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখিয়েছ। সন্ত্রাসকে গোড়া থেকে নির্মূল করার সময় এসেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার লক্ষ্য কি শুধুই পাকিস্তানকে টার্গেট করা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পাকিস্তান নয়, ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশও। কারণ সম্প্রতি বাংলাদেসেও কট্টরপন্থী মৌলবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশেও তাদের জঙ্গি নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে। পহেলগাঁও কাণ্ডের অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের মধুর সম্পর্ক নজরে রেখেছিলো নয়া দিল্লি। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান-সহ পাকিস্তানী সেনার বেশ কয়েটি শীর্ষ প্রতিনিধিদলের ঢাকা ও চট্টগ্রাম সফরের দিকে নজর রেখেছিলো ভারতীয় গোয়েন্দারা। অতি সম্প্রতি পনেরো বছরের বরফ কাটিয়ে পাকিস্তানের বিদেশসচিব আমনা বালোচ বাংলাদেশ সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর যৌথ ঘোষণা করেছিলেন।
এবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনি উপদেষ্টা আসিফ নজরুল পহেলগাম কাণ্ডের একদিন পর লস্কর-ই-তইবার বাংলাদেশ শাখার নেতা ইজ়হারের সঙ্গে দেখা করেছেন। গোয়েন্দা সূত্রে আসা এই খবর উদ্বেগ বাড়িয়েছে নয়া দিল্লির। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মাটিতে এই ইজ়হারের নাশকতার প্লট রচনার অতীত ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত ২০টি সন্ত্রাসবাদী কাণ্ডে অভিযুক্ত ইজ়হার হাসিনা সরকারের নিরাপত্তা শাখার নজরদারি তালিকায় ছিল। এখন মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। অন্য দিকে গত শুক্রবার ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি অনুষ্ঠানে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসিফ বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বকে আরও ‘গভীর’ করার বার্তা দিয়েছেন। সবমিলিয়ে পাকিস্তানের দিকে বাড়তি নজর দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে হালকা ভাবে নিলে হবে না বলেই মত গোয়েন্দাদের একাংশের। তাই এস জয়শঙ্কর ও অজিত ডোভালের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এদিনের বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতএব, শুধু পাকিস্তান নয়, ভারতের রাডারে বাংলাদেশও আছে।












Discussion about this post