পহেলগাঁও হামলার পরই পাকিস্তানকে দায়ী করে একের পর ঝটকা দিচ্ছে ভারত। এরমধ্যে সবচেয়ে হাইভোল্টেজ ঝটকা হল সিন্ধু জল চুক্তি বাতিল করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্জিক্যাল বা এয়ার স্ট্রাইকের থেকেও এই ওয়াটার স্ট্রাইক অনেক বেশি কার্যকর পাকিস্তানের জন্য। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বেশ কয়েকবার সরাসরি যুদ্ধ হয়েছে। সেই সঙ্গে কয়েকশোবার ভারতে জঙ্গি হানা হয়েছে, যার পিছনে পাকিস্তানের হাত প্রমাণিত। কিন্তু কোনও বারই ভারত ৬৫ বছরের সিন্ধু জল চুক্তি বাতিল করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তবে এবার করল, বিশেষজ্ঞদের মতে, সহ্যের সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করে গিয়েছিল পাকিস্তান। ভারতের সঙ্গে ক্রমাগত ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে তাঁরা নিজেরাই কার্যত ভিখারি দেশে পর্যবসিত হয়েছে। তবুও ভারতকে বিব্রত করার কোনও চেষ্টা বাদ রাখেনি তাঁরা। তবে ভারত বরাবরই ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তান যেমন বরাবর দাবি করে কাশ্মীর তাঁদের জুগলার ভেইন বা ঘাঁড়ের শিরা বা গর্ভস্থ শিরা। অর্থাৎ যে শিরা আমাদের ঘাড়ের রক্তনালী যা মাথা এবং ঘাড় থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্তকে হৃদপিণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মানবদেহের রক্ত সঞ্চালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তানের কাছে কাশ্মীর কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝাতেই সম্প্রতি পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এরকমই এক মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু পাকিস্তান ভুলে গিয়েছিল যে তাঁদের প্রধান শিরা হল সিন্ধু নদ, এবং উপশিরা হল সিন্ধু নদের শাখানদীগুলি। ভারত এবার তাতেই আঘাত হানলো। ফলে ভারতের সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত, পাকিস্তানকে একেবারেই নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ তাঁরা জানে এই সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে কতটা বড় ধাক্কা। যদিও পাক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বহু ভারতীয় নদী বিশেষজ্ঞও প্রশ্ন তুলেছিলেন নদীর জল পাকিস্তানে যাওয়া কীভাবে বন্ধ করবে নরেন্দ্র মোদি সরকার? কিন্তু কয়েকটা দিন যেতেই তাঁরা জবাব পেতে শুরু করেছেন। প্রথমেই দেখা গেল, জম্মু ও কাশ্মীরের রামবন এলাকায় বাগলিহার হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্পে চেনাব নদীর ওপর নির্মিত বাঁধে জল আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে চেনাব নদীতে জলের স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। যা পাকিস্তানের কাছে প্রথম অশনীসংকেত। এরপর দেখা গেল, পাকিস্তানকে না জানিয়েই উরি বাঁধ থেকে বিতস্তা নদীর জল ছেড়ে দেয় ভারত। এর ফলে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিস্তৃর্ণ এলাকায় আচমকা বিপুল জল ঢুকে পড়ে। যার ফলে প্রবল বন্যা দেখা দেয় ওই এলাকায়। এমনকি পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারত আন্তর্জাতিক জলচুক্তি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করেছে। ‘জল সন্ত্রাস’ তৈরি করেছে। যদিও নয়াদিল্লির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।
এখানেই শেষ নয়, পাকিস্তানকে উচিৎ শিক্ষা দিতে জলকেই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার করতে চলেছে ভারত। জানা যাচ্ছে, দ্রুততার সঙ্গে তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে পাখির চোখ করা হয়েছে। কিষাণগঙ্গা, রতলে এবং পকল দুল এই তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সিন্ধু নদকেই ভূ-কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে চাইছে ভারত। ২০১৮ সালে কিষাণগঙ্গা প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এই প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ তৈরির জন্য বাঁধ নির্মানের পাশাপাশি বিতস্তা বা ঝিলম নদী থেকে ২৩ কিলোমিটার লম্বা একটি সুরঙ্গও তৈরি হচ্ছে। এবার সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত হওয়ার ফলে ভারত অনায়াসেই সেই সুরঙ্গ থেকে আরও সুরঙ্গ তৈরি করে জল অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রতলে এবং পকল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন ২০২১ সালে। এখানেও চেনাব নদীর জল সুরঙ্গের মাধ্যমে ঘুরিয়ে আনার কাজ করছেন ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা। আাগমী বছরই পকলে দুল প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এখানে হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা জম্মু ও কাশ্মীরের সর্ববৃহৎ বলে দাবি করা হচ্ছে। সিন্ধু এবং তাঁর শাখা নদীগুলি মূলত পাকিস্তানের দিকেই বয়ে গিয়েছে। তাই ভারত যদি সুরঙ্গ ও খাল খনন করে নদীর জল বাইপাস করে দিতে পারে, তাহলেই কেল্লাফতে।
সূত্রের খবর, ভারত আরও বড় পরিকল্পনা করেছে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করার। এর জন্য ভারত হাত মিলিয়েছে আফগানিস্তানের সঙ্গেও। আমরা জানি এই মুহূর্তে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক একেবারেই ভালো নয়। রবিবারই ভারতের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল কাবুল পৌঁছে গিয়েছে। সূত্রের খবর, আফগানিস্তানে কাবুল ও কুর্রম নদীতে বাঁধ দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় ভারত। যে চুক্তি আগেই করে রেখেছিল ভারত সরকার। রবিবার কাবুলে আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সাথে একটি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক করেন ভারতীয় প্রতিনিধিদল। উল্লেখ্য ২০২১ সালে ভারত সরকার কাবুলে শাহতুত বাঁধ নির্মাণের জন্য ২৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যা প্রায় ২০ লক্ষ বাসিন্দার জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করবে এবং আফগানিস্তান জুড়ে সেচের জল সরবরাহ করবে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শাহতুত নদীর জলপ্রবাহ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে। যা পাকিস্তানের কাছে আরও বড় ধাক্কা। অর্থাৎ, শুধু সপ্ত সিন্ধু নয়, আফগানিস্তানের কয়েকটি নদীবাঁধ প্রকল্পে ভারত সহায়তা করে পাকিস্তানে জলের সরবরাহ আরও কমিয়ে হাইভোল্টেজ ঝটকা দিতে চলেছে ভারত। এই ঝটকা কোনও পরমানু বোমার থেকে কম নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞমহল।












Discussion about this post