প্রতিবেদন শুরু করা যাক প্যালেস্তাইনের কবি মাহমুদ দারউইশের একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি দিয়ে। “Right down/ I am an Arab. ” দারউইস এই কবিতাটি লিখেছিলেন ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। প্যালেস্তাইনের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে গান হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল। সত্যজিত রায়ের গুপি গাইন বাঘা বাইনের এই গানখানি বাদ থাকে কী করে – “ওরে বাবা দেখো চেয়ে কত সেনা চলেছে সমরে”। ওই গানেই রয়েছে – “ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল। মিথ্যে অস্ত্রশস্ত্র ধরে, প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে, রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে, দ্বন্দ্বে অমঙ্গল।”
কিম্বা অ্যালান কুর্দি? সমুদ্রের ধারে বালুকাবেলায় সে মৃত অবস্থায় পড়েছিল। গোটা বিশ্বকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছিল একটা ছবি। সকলেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আগামীদিনে আর কোনও যুদ্ধই হবে না। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুধিবে কে? ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করল আমেরিকা এবং ইজরায়েল। তেহরানকে শিক্ষা দিতে তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে আরব দুনিয়া। অন্তত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য তেমনই। তাঁর এই বক্তব্য একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে – তবে কি ইরানের রণনীতিতে ভয় পাচ্ছে আমেরিকা?। যদিও আমেরিকার দাবি, লম্বা লড়াইয়ে তারা এগিয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াতেও বেজেছে যুদ্ধের দামামা। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে গিয়েছে আফগানিস্তান। এর মধ্যে পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র করছে ভারত। এই খবর কি সত্যি? না কি অস্থির পরিস্তিতির সুযোগ নিয়ে স্থিতিশীল ভারতকে তারা অস্থির করে তুলতে চাইছে? মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে কোনও কোনও মহলে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইরান হয়তো ব্যাকফুটে চলে যাবে। যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ততই আগ্রাসী হয়ে উঠেছে তেহরান। তার প্রমাণ সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ওমান, বাহারিন, কুয়েত, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডনে হামলা।
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে লেবানন। যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই লেবানন থেকে ইজরায়েলের ওপর হামলা শুরু করছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। জবাবি হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। মঙ্গলবার সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ জানিয়েছে, তাদের খতমের তালিকায় রয়েছেন হেজবুল্লা প্রধান নইম কাসেম। জানিয়েছেন, খুব তাড়াতাড়ি তাকে নিকেশ করা হবে। ইরানকেও তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানের উদ্দেশ্যে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, যে বা যারা খামেইনির পথ অনুসরণ করবে, তাদের একই পরিণতি হবে। তাঁর ঠাঁই হবে নরকে। ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকার কাছে সীমাহীন অস্ত্রের মজুত রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত জারি রাখতে তারা সক্ষম।
সংঘাত যে এখনই থামছে, সেটা স্পষ্ট। ইরান দাবি করেছে, তাদের পরমাণু ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল ও আমেরিকা। যদিও এই হামলার কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, তাদের কাছে কোনও পারমাণবিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নেই। তারা এখন ইরানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি। তবে চেষ্টা চলছে। ইরানের তরফ থেকেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পারমাণবিক ঘাঁটিতে হামলা হলে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়বে মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্য নিশ্চিহ্ন হলে তাঁর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতেও। আন্তর্জাতিকমহল একটা বিষয়ে নিশ্চিত ছিল এবং তাঁদের আশঙ্কা ছিল যে ইরান হরমুজ প্রণালীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। তাদের সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে। এই প্রণালী বিশ্বের ব্যস্ততম তেলবাহী রুট। প্রতিদিনি এই পথ দিয়ে প্রায় ২০-২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে জলপথ স্তব্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে। বর্তমানে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মাঝখানে এই প্রণালীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় সাতশোটি ট্যাংক। এই রাস্তা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে প্রভাব পড়বে ভারতেও। কারণ, ভারত যত তেল আমদানি করে তার ৭০ শতাংশ আসে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এদিকে, নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ অন্তহীন লড়াই চান না। দ্রুত এবং চূড়ান্ত কোনও পদক্ষেপ করতে চান। সব মিলিয়ে একটা ডামাডোল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরানের বার্তা স্পষ্ট – তাদের ভূখণ্ডে হামলা মানেই সীমিত সংঘাত নয়., বরং বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা












Discussion about this post