বাংলাদেশের জনগণের সাথে অনেকেই আশা করেছিলেন যে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ খুলে যাবে। কিন্তু হল ঠিক উল্টোটাই। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বসার পর থেকেই বাংলাদেশ আর ধর্মনিরপেক্ষ নেই, বরং হাসিনাকে উৎখাত করার পিছনে পেশীশক্তি হিসেবে কাজ করা ইসলামিক কট্টরপন্থী সংগঠনগুলি অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁরাই আজ বাংলাদেশের নির্ণয়ক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, এক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইউনূস একজন “নামমাত্র” শাসকে পরিণত হয়েছেন। যদিও নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ গোটা বিশ্বেই জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ও মাইক্রো ফিনান্সের জন্য। তাঁর নোবেল পুরস্কারের পিছনে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন ইউনূসের পক্ষে তদবিরের ঘটনাও অনেকে অস্বীকার করেন না। এ কথা অনস্বীকার্য যে, মুহাম্মদ ইউনূস হিলারি ক্লিন্টন ফাউন্ডেশনে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন। ফলে তাঁর নোবেল পাওয়ার পিছনে যতটা না পরিষেবার সম্পর্ক তার চেয়েও বেশি ভূ রাজনৈতিক অঙ্ক জড়িত। যাইহোক, বর্তমান বাংলাদেশে তিনিই কার্যত সর্বময় কর্তা এবং তাঁর পিছনে ইসলামিক শক্তিগুলি একজোট হওয়া এক অন্য বার্তা দেয়।
ইউনূসের শাসনকালের এক বছরে বাংলাদেশ সামাজিক ও গণতান্ত্রিকভাবে কতটা পিছিয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খুব একটা মাথা ঘামায়নি। এর পিছনেও ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রভাব। কিন্তু বিগত এক মাসে পরিস্থিতি পাল্টেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি এবং রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে চিন ও ভারতকে কোন ঠাসা করার প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতি বদলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এসসিও সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিংপিন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন। নরেন্দ্র মোদি তিন সফরে যাওয়ার আগে জাপানেও দুদিন ঘুরে এসেছিলেন। এরপরই আচমকা পরিবর্তন হয় পরিস্থিতি। চিন, রাশিয়া ভারতের পাশে দাঁড়ায় এবং জাপানও ভারতে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে নরেন্দ্র মোদি জাপান সফর সেরে ফেরার পরই জাপানের প্রথম সারির এক সংবাদপত্র বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যা নিয়ে এখন আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
দি জাপান টাইমসের হেডলাইন হল, “বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি টাইম বোমা”। তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিভাবে মুহাম্মদ ইউনূসের রাজত্বে ইসলামিক জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। কিভাবে মুহাম্মদ ইউনূস একের পর এক শীর্ষ জঙ্গিনেতাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আবার বাংলাদেশের বর্তমান মব সন্ত্রাস ও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনা-সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর থেকে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে গেছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, উগ্র ইসলামপন্থী শক্তিগুলি তাদের অবস্থান আরও জোরদার করছে, তরুণরা ক্রমশ উগ্রপন্থী হয়ে উঠছে, আইনশৃঙ্খলার কবলে পড়ছে এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। দেশের ভবিষ্যৎ এর আগে কখনও এতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে দেখা যায়নি। এই প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যাচ্ছে, জাপানি ওই সংবাদপত্র বোঝাতে চাইছে মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ ক্রমশ উগ্র ইসলামিক জঙ্গি দেশে পরিণত হচ্ছে।
কেন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার টাইম বোমা? এটা বোঝাতে গিয়ে দি জাপান টাইমস লিখেছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাপক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচন বারবার স্থগিত করা হয়েছে। সাংবিধানিক বৈধতা না থাকা সত্ত্বেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপক নির্মূল অভিযান শুরু করেছে। প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণ করেছে এবং দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম রাজনৈতিক দল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যা বাংলাদেশকে স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করেছিল। ইউনূসের সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন বৃদ্ধি এবং দমন-পীড়ন তীব্রতর করারও নেতৃত্ব দিয়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতোই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে তা স্পষ্ট। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল মনে করছেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে আর বেশিদিন ক্ষমতায় রাখলে বাংলাদেশ টাইম বোমার মতোই বিস্ফোরিত হবে। বাংলাদেশে ইসলামিক শক্তিগুলি জঙ্গিবাদের প্রচার ও প্রসার যেভাবে ঘটাচ্ছে তাতে সেই দিন খুব দূরে নয় যেদিন বড় ধরণের নাশকতা শুরু হবে। আন্তর্জাতিক মহল এবার ধীরে ধীরে মুহাম্মদ ইউনূসের মাথার উপর থেকে হাত তুলে নিচ্ছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে চিন ও রাশিয়া। ট্রাম্পের ট্যারিফ ধাক্কা সামলাতে এবার জাপানও ভারতের পাশে চলে এসেছে। সবমিলিয়ে কোনঠাসা ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকে থাকা ইউনূস এবার আন্তর্জাতিক আঙিনায় একঘরে হয়ে পড়ছেন।












Discussion about this post